ইস্ট্রোজেন কমার পর নারীদের হার্ট সুস্থ রাখতে করণীয়

ইস্ট্রোজেন কমার পর নারীদের হার্ট সুস্থ রাখতে করণীয় 1

মেনোপজ বা মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া একজন নারীর জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু এই পরিবর্তনের সাথে সাথে হৃদরোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। মেনোপজের আগে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় হৃদরোগ থেকে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত থাকেন। এই সুরক্ষার মূল কারণ হলো ‘ইস্ট্রোজেন’ হরমোন। মেনোপজের পরে শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়, ফলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বেড়ে যায় এবং ভালো কোলেস্টেরল (HDL) কমে যায়। এতে রক্তনালীতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ে, যা হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের দিকে ধাবিত করে। এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিকল্পিত পরিবর্তন আনা অপরিহার্য।

ইস্ট্রোজেন কীভাবে হার্টকে রক্ষা করে?

ইস্ট্রোজেন হরমোন রক্তনালীগুলোকে নমনীয় ও প্রসারিত রাখতে সাহায্য করে, যা রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া, এটি LDL কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণ করে রক্তনালীতে চর্বি জমার (Plaque build-up) প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। যখন মেনোপজ হয় এবং ইস্ট্রোজেন কমে যায়, তখন এই সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং নারীর হৃদরোগের ঝুঁকি পুরুষের সমতুল্য বা তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

মেনোপজ পরবর্তী হার্ট সুস্থ রাখার ডায়েট

হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে মেডিটেরানিয়ান ডায়েট বা ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসকে সেরা বলে মনে করেন কার্ডিওলজিস্টরা।

 যা খাবেন:

১. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: এটি ট্রাইগ্লিসারাইড এবং রক্তচাপ কমাতে, সেইসাথে রক্তনালীতে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

  • উৎস: তৈলাক্ত মাছ (স্যামন, টুনা, ইলিশ), আখরোট, তিসির বীজ, চিয়া বীজ।

২. দ্রবণীয় ফাইবার (Soluble Fiber): দ্রবণীয় ফাইবার হজম নালীতে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) শোষণ করে নেয় এবং তা শরীর থেকে বের করে দেয়।

  • উৎস: ওটস, যব (Barley), ডাল (ছোলা, মসুর), আপেল, বেরি ফল।

৩. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও সবজি: ফল ও সবজিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তনালীকে ফ্রি-র‌্যাডিক্যালের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

  • উৎস: গাঢ় সবুজ শাক, টমেটো, ক্যাপসিকাম।

৪. অলিভ অয়েল ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: অলিভ অয়েল, বাদাম, ও অ্যাভোকাডোতে থাকা মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট হার্টের জন্য উপকারী।

৫. ফাইটোইস্ট্রোজেন (Phytoestrogens): সয়া বা ফ্ল্যাক্সসিডে থাকা এই যৌগগুলো শরীরে দুর্বল ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে, যা কিছু হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

  • উৎস: সয়াবিন, তফু, ফ্ল্যাক্সসিড (গুঁড়ো করে)।

যা খাবেন না বা এড়িয়ে চলবেন:

১. স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট: লাল মাংস, প্রক্রিয়াজাত পনির, মাখন এবং তেলে ভাজা খাবারে এই ফ্যাটগুলো বেশি থাকে, যা LDL কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়।

২. অতিরিক্ত সোডিয়াম: উচ্চ সোডিয়াম (লবণ) রক্তচাপ বাড়ায় এবং হার্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। প্রসেসড খাবার এবং প্যাকেটজাত স্যুপ এড়িয়ে চলুন।

৩. অতিরিক্ত চিনি: অতিরিক্ত চিনি শুধুমাত্র ডায়াবেটিস নয়, এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতেও মুখ্য ভূমিকা রাখে।

৪. অ্যালকোহল: অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্ট ফেইলউরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

 লাইফস্টাইল টিপস:

  • ব্যায়াম: সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের কার্ডিও (হাঁটা, সাঁতার) এবং ২ দিন প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম (Resistance Training) করুন।
  • নিয়মিত চেক-আপ: রক্তচাপ, কোলেস্টেরল (LDL, HDL) এবং ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়মিত পরীক্ষা করান।

মেনোপজের পরে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে আপনি আপনার হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে পারেন এবং দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন লাভ করতে পারেন।

রেফারেন্স লিঙ্ক:

Scroll to Top