ইস্ট্রোজেন হলো নারীদের প্রধান হরমোন, যা শুধুমাত্র প্রজনন নয়, হাড়ের স্বাস্থ্য, হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা, মেজাজ এবং ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মেনোপজের (মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া) সময় ডিম্বাশয় থেকে ইস্ট্রোজেনের উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমে যায়, যার ফলে হট ফ্লাশ, রাতের ঘাম, মেজাজের পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা এবং হাড় ক্ষয়ের মতো বিভিন্ন কষ্টকর লক্ষণ দেখা দেয়।
এই লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকেরা অনেক সময় হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT) ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তবে অনেকেই আছেন যারা প্রাকৃতিক উপায়ে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কিছুটা সামঞ্জস্য করতে চান। এক্ষেত্রে ‘ফাইটোইস্ট্রোজেন’ (Phytoestrogens) সমৃদ্ধ খাবারগুলো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
ফাইটোইস্ট্রোজেন কীভাবে কাজ করে?
ফাইটোইস্ট্রোজেন হলো উদ্ভিদজাত যৌগ, যা রাসায়নিক গঠনে মানুষের ইস্ট্রোজেনের (Estradiol) মতো। এই যৌগগুলো যখন শরীরে প্রবেশ করে, তখন তারা কোষের ইস্ট্রোজেন রিসেপ্টর সাইটগুলিতে (Estrogen Receptor Sites) দুর্বলভাবে আবদ্ধ হয়। এই প্রক্রিয়াকে ‘ইস্ট্রোজেনিক অ্যাকশন’ বলা হয়।
- ইস্ট্রোজেন ঘাটতি হলে: মেনোপজের পরে যখন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা খুব কম থাকে, তখন ফাইটোইস্ট্রোজেনগুলো রিসেপ্টরে আবদ্ধ হয়ে ইস্ট্রোজেনের দুর্বল প্রভাব ফেলে, যা হট ফ্লাশের মতো লক্ষণগুলো উপশম করতে পারে।
- ইস্ট্রোজেন আধিক্য হলে: যদি কোনো কারণে শরীরে ইস্ট্রোজেন বেশি থাকে, তবে ফাইটোইস্ট্রোজেন শক্তিশালী ইস্ট্রোজেনকে রিসেপ্টরে আবদ্ধ হতে বাধা দেয়, ফলে ইস্ট্রোজেনের সামগ্রিক প্রভাব কমে আসে।
হরমোনের ভারসাম্যে চিকিৎসকের পরামর্শ
যা খাবেন:
১. তিসির বীজ (Flaxseeds): এটি ‘লিগনানস’ (Lignans) নামক ফাইটোইস্ট্রোজেনের সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হট ফ্লাশের ফ্রিকোয়েন্সি কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন ১-২ চামচ গুঁড়ো করা তিসির বীজ ওটস বা দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খান।
২. সয়াবিন ও সয়া পণ্য: সয়ায় ‘আইসোফ্ল্যাভোনস’ (Isoflavones) থাকে, যা ইস্ট্রোজেনের দুর্বল প্রতিলিপি।
- উৎস: তফু, সয়া দুধ, এডামামে।
৩. ডাল ও ছোলা: মটরশুঁটি, মসুর ডাল এবং ছোলাতে মাঝারি পরিমাণে ফাইটোইস্ট্রোজেন এবং প্রচুর ফাইবার থাকে।
৪. ফল ও সবজি: বেরি ফল, আপেল, গাজর, এবং ব্রোকলিতেও লিগনানস থাকে।
সহায়ক পুষ্টি:
- বি ভিটামিন: ভিটামিন বি৬, বি৯ (ফোলেট) এবং বি১২ লিভারকে হরমোন মেটাবলাইজ করতে সাহায্য করে।
- ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি: ইস্ট্রোজেনের ঘাটতিতে হাড়ের ক্ষয় বাড়ে, তাই হাড়ের সুরক্ষার জন্য এই দুটি উপাদান জরুরি।
যা খাবেন না:
১. অতিরিক্ত ক্যাফেইন: গবেষণায় প্রমাণিত, অতিরিক্ত ক্যাফেইন হট ফ্লাশ এবং রাতের ঘামকে ট্রিগার করতে পারে।
২. ঝাল ও মশলাযুক্ত খাবার: মেনোপজকালীন সময়ে কিছু নারীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার খেলে হট ফ্লাশের অনুভূতি বাড়ে।
৩. অতিরিক্ত চিনি: এটি ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা মেজাজের পরিবর্তন (Mood Swings) বাড়াতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
ফাইটোইস্ট্রোজেনযুক্ত খাবারগুলো নিরাপদ হলেও, যদি আপনার স্তন ক্যান্সারের মতো ইস্ট্রোজেন-সংবেদনশীল রোগের ইতিহাস থাকে, তবে উচ্চ মাত্রায় সয়া বা তিসির বীজ খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ইস্ট্রোজেন-সমৃদ্ধ খাবারগুলো মেনোপজকালীন লক্ষণ উপশমের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক হাতিয়ার। তবে এটি হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির বিকল্প নয়। সঠিক খাদ্য এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি হরমোনের পরিবর্তনগুলো ভালোভাবে সামলে নিতে পারেন।
ফ্যাক্ট চেক ও রেফারেন্স লিঙ্ক (E-E-A-T):





