থাইরয়েড গ্রন্থি হলো আমাদের গলার সামনের দিকে থাকা প্রজাপতির আকৃতির একটি ছোট অঙ্গ, যা শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী গুরুত্বপূর্ণ হরমোন (T3 এবং T4) উৎপাদন করে। নারীদের মধ্যে থাইরয়েডের সমস্যা, বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজম (Thyroid hormone কম উৎপাদন) খুবই সাধারণ। গর্ভাবস্থা, মেনোপজ বা অটোইমিউন রোগের কারণে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং সঠিক জীবনযাত্রা না মানলে এটি শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই কনটেন্টে হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণ, লক্ষণ এবং খাদ্য তালিকার মাধ্যমে কীভাবে থাইরয়েডকে সুস্থ রাখা যায়, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
হাইপোথাইরয়েডিজম কেন হয়?
হাইপোথাইরয়েডিজম হলো এমন একটি অবস্থা যখন থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের প্রয়োজনীয় মাত্রায় হরমোন তৈরি করতে পারে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর কারণ হলো ‘হাশিমোটো’স থাইরয়েডাইটিস’ (Hashimoto’s Thyroiditis), যা একটি অটোইমিউন রোগ। এখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাই ভুল করে থাইরয়েড কোষগুলোকে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে দেয়। হরমোনের ঘাটতির কারণে শরীরের মেটাবলিক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
হাইপোথাইরয়েডিজমের প্রধান লক্ষণ:
- অত্যধিক ক্লান্তি এবং দুর্বলতা
- অকারণে ওজন বৃদ্ধি
- ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা
- চুল পাতলা হয়ে যাওয়া এবং ঝরে পড়া
- শুষ্ক ত্বক
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- অনিয়মিত বা অতিরিক্ত মাসিক
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী থাইরয়েড সুস্থ রাখার গাইড
হাইপোথাইরয়েডিজম চিকিৎসার প্রধান ভিত্তি হলো হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (Levothyroxine), তবে সঠিক পুষ্টি ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
যা খাবেন:
১. সঠিক পরিমাণে আয়োডিন: থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন অপরিহার্য। আয়োডিনের অভাবেও হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে।
- উৎস: আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ (যেমন টুনা), ডিম, দই।
সতর্কতা: যাদের হাশিমোটো আছে, তাদের অতিরিক্ত আয়োডিন এড়িয়ে চলাই ভালো, তাই পরিমাণ নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
২. সেলেনিয়াম (Selenium): এই মিনারেল T4 (Inactive hormone) কে T3 (Active hormone) তে রূপান্তরের জন্য অপরিহার্য। এটি থাইরয়েডের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।
- উৎস: ব্রাজিল নাট (প্রতিদিন ১টি যথেষ্ট), ডিম, মুরগির মাংস, সূর্যমুখী বীজ।
৩. জিঙ্ক (Zinc): এটিও থাইরয়েড হরমোন সংশ্লেষণে সাহায্য করে।
- উৎস: কুমড়োর বীজ, ছোলা, ডাল।
৪. ভিটামিন ডি: থাইরয়েডের অনেক রোগীর শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা যায়। সকালে সূর্যের আলোতে থাকুন এবং ডিমের কুসুম খান। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নিন।
৫. অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি খাবার: এই খাবারগুলো শরীরের প্রদাহ কমায়, যা অটোইমিউন রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- উৎস: তৈলাক্ত মাছ (ওমেগা-৩), হলুদ, ফল ও সবজি।
যা খাবেন না:
১. কাঁচা ক্রুসিফেরাস সবজি (Goitrogens): ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রোকলি, কেল এর মতো সবজিতে ‘গোয়ট্রোজেন’ নামক উপাদান থাকে, যা অতিরিক্ত পরিমাণে কাঁচা খেলে থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।
- সুপারিশ: এই সবজিগুলো পুরোপুরি বাদ দেবেন না। রান্না করে বা সেদ্ধ করে খান, কারণ তাপ গোয়ট্রোজেনের প্রভাব কমিয়ে দেয়।
২. সয়া (Soy): সয়াবিনের যৌগগুলো (Isoflavones) থাইরয়েড হরমোন গ্রহণ বা শোষণে বাধা দিতে পারে।
- সুপারিশ: সয়াযুক্ত খাবার পরিমিত খান এবং থাইরয়েডের ওষুধ খাওয়ার ৪ ঘণ্টা পর সয়া খান।
৩. গ্লুটেন (Gluten): হাশিমোটো রোগীদের অনেকেরই গ্লুটেনে সংবেদনশীলতা থাকে। গ্লুটেন অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা অটোইমিউন প্রতিক্রিয়াকে বাড়িয়ে দেয়।
- সুপারিশ: গম বা বার্লির মতো গ্লুটেন-যুক্ত খাবার খাওয়ার পরে অসুস্থ বোধ করলে গ্লুটেনমুক্ত ডায়েট অনুসরণ করার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৪. আয়রন ও ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট: এই সাপ্লিমেন্টগুলো লেভোথাইরক্সিন (Thyroid medication) শোষণে মারাত্মকভাবে বাধা দেয়।
- সুপারিশ: থাইরয়েড ওষুধ খাওয়ার কমপক্ষে ৪ ঘণ্টা আগে বা পরে এই সাপ্লিমেন্টগুলো গ্রহণ করুন।
হাইপোথাইরয়েডিজম একটি জীবনব্যাপী অবস্থা, কিন্তু সঠিক ওষুধ এবং একটি বিজ্ঞানসম্মত খাদ্য তালিকা মেনে চললে এর উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। থাইরয়েডের ওষুধ সবসময় খালি পেটে এবং অন্যান্য সাপ্লিমেন্ট থেকে দূরে থেকে খান। যেকোনো ডায়েটারি পরিবর্তন করার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যিক।
রেফারেন্স লিঙ্ক:





