শীতে ত্বকের সুরক্ষা: শুষ্কতা ও ফাটা রোধে বিজ্ঞানসম্মত ডায়েট ও ঘরোয়া যত্ন

শীতে ত্বকের সুরক্ষা শুষ্কতা ও ফাটা রোধে বিজ্ঞানসম্মত ডায়েট ও ঘরোয়া যত্ন 1

শীতকাল মানেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর এবং আরামদায়ক আবহাওয়া। কিন্তু এই ঋতুটি আমাদের ত্বকের জন্য খুব একটা সুখকর নয়। শীতের শুরুতে অনেকের ত্বক খসখসে হয়ে যায়, উজ্জ্বলতা হারায় এবং ঠোঁট, হাত-পা বা গোড়ালি ফাটতে শুরু করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘জেরোসিস’ (Xerosis) বা অস্বাভাবিক শুষ্ক ত্বক। অনেকে মনে করেন শুধু বাইরে থেকে লোশন বা কোল্ড ক্রিম মাখলেই এই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা বা হাইড্রেটেড রাখার প্রক্রিয়াটি আসলে শুরু হয় শরীরের ভেতর থেকে।

আজকের এই আলোচনা থেকে আমরা জানব, কেন শীতে ত্বক ফাটে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে খাবার ও ঘরোয়া প্যাকের মাধ্যমে কীভাবে ত্বককে সতেজ রাখা সম্ভব।

শীতে ত্বক কেন ফাটে?

আমাদের ত্বকের সবচেয়ে বাইরের স্তরটিকে বলা হয় ‘স্ট্র্যাটাম কর্নিয়াম’ (Stratum Corneum)। একে একটি ইটের দেয়ালের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে ত্বকের কোষগুলো হলো ইট, আর প্রাকৃতিক তেল বা লিপিড (Lipid) হলো সিমেন্ট। এই লিপিড ব্যারিয়ার বা দেওয়াল শরীরের ভেতরের আর্দ্রতা বাইরে যেতে বাধা দেয় এবং বাইরের জীবাণু ঢুকতে দেয় না। শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা বা হিউমিডিটি কমে যায়। এই শুষ্ক বাতাস ত্বক থেকে পানি শুষে নেয়। ফলে ত্বকের সেই লিপিড ব্যারিয়ার দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভেঙে যায়। যখন এই সুরক্ষা দেওয়াল ভেঙে যায়, তখন ত্বকের কোষগুলো সংকুচিত হয় এবং চামড়ায় ফাটল ধরে। একারণেই শীতে ত্বক চুলকায়, খসখসে হয় এবং ফেটে রক্ত বের হতে পারে।

 চিকিৎসকের পরামর্শ: ত্বকের জন্য ডায়েট চার্ট

 যা খাবেন:

১. অ্যাভোকাডো ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: অ্যাভোকাডোতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। বিজ্ঞানমতে, এই স্বাস্থ্যকর চর্বি ত্বকের কোষের ঝিল্লি বা মেমব্রেনকে নমনীয় ও শক্তিশালী করে। এটি ত্বককে ভেতর থেকে ময়েশ্চারাইজ করে।

২. বাদাম ও বীজ: কাঠবাদাম (Almonds), আখরোট (Walnuts), এবং তিসির বীজ (Flaxseeds) হলো ভিটামিন ই এবং ওমেগা-৩ এর খনি। ভিটামিন ই একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ত্বককে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখে।

৩. কমলা ও সাইট্রাস ফল: শীতের ফল কমলা, মাল্টা বা লেবুতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। ভিটামিন সি কোলাজেন (Collagen) তৈরিতে সাহায্য করে। কোলাজেন ত্বককে টানটান রাখে এবং দ্রুত ফাটল সারাতে সাহায্য করে।

৪. মিষ্টি আলু ও গাজর: এগুলোতে থাকে বিটা-ক্যারোটিন, যা শরীরে ভিটামিন ‘এ’-তে রূপান্তরিত হয়। ভিটামিন এ ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং শুষ্কতা রোধ করে।

যা খাবেন না বা এড়িয়ে চলবেন:

১. অতিরিক্ত ক্যাফেইন: চা বা কফি বেশি পান করলে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায় (Diuretic effect), যা ত্বককে আরও শুষ্ক করে তোলে।

২. অতিরিক্ত চিনি: চিনি ত্বকের কোলাজেন ভেঙে দেয় (Glycation), ফলে ত্বক দ্রুত বুড়ি হয়ে যায় এবং নমনীয়তা হারায়।

৩. লবণাক্ত খাবার: অতিরিক্ত সোডিয়াম বা লবণ শরীরের কোষ থেকে পানি শুষে নেয়, ফলে ত্বক নিস্তেজ দেখায়।

 ত্বকের যত্নে কার্যকরী ঘরোয়া প্যাক

রাসায়নিক পণ্যের বদলে রান্নাঘরের কিছু উপাদান ত্বকের ময়েশ্চারাইজার হিসেবে দারুণ কাজ করে।

  • মধু ও দুধের প্যাক: মধু হলো প্রাকৃতিক ‘হিউমেকট্যান্ট’ (Humectant), অর্থাৎ এটি বাতাস থেকে আর্দ্রতা টেনে নিয়ে ত্বকে আটকে রাখে। দুধের ল্যাকটিক অ্যাসিড মৃত কোষ দূর করে।
    • ব্যবহার: এক চামচ খাঁটি মধুর সাথে এক চামচ কাঁচা দুধ মিশিয়ে মুখে ও গলায় লাগান। ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
  • অলিভ অয়েল ও চিনির স্ক্রাব (বডি স্ক্রাব): শীতে মৃত কোষ জমে ত্বক খসখসে হয়ে যায়।
    • ব্যবহার: গোসলের আগে অলিভ অয়েলের সাথে সামান্য চিনি মিশিয়ে কনুই, হাঁটু ও গোড়ালিতে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। এরপর ধুয়ে ফেলুন।

 চিকিৎসকের জরুরি টিপস:

  • গরম পানি ব্যবহারে সতর্কতা: শীতে আরামের জন্য আমরা খুব গরম পানিতে গোসল করি। অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে। তাই সবসময় কুসুম গরম (Lukewarm) পানি ব্যবহার করুন।
  • ময়েশ্চারাইজিং-এর সঠিক সময়: ত্বক পুরোপুরি শুকানোর আগেই, অর্থাৎ তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মোছার পরপরই (৩ মিনিটের মধ্যে) ময়েশ্চারাইজার বা লোশন লাগান। এটি আর্দ্রতা লক করতে সাহায্য করে।
Scroll to Top