চুল পড়া বা হেয়ার ফল নারীদের একটি সাধারণ সমস্যা হলেও, গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের পরে এর তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়। গর্ভাবস্থায় অনেকের চুল ঘন ও উজ্জ্বল হয়, কিন্তু সন্তান জন্মদানের ২ থেকে ৪ মাস পর হঠাৎ করেই অতিরিক্ত চুল পড়তে শুরু করে, যা নতুন মায়েদের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। এই ঘটনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পোস্টপার্টাম টেলোজেন এফ্লুভিয়াম’ (Postpartum Telogen Effluvium) বলা হয়। এটি একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সাময়িক প্রক্রিয়া। এই কনটেন্টে গর্ভাবস্থা ও প্রসব পরবর্তী সময়ে চুল পড়ার পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণ, প্রতিরোধের উপায় এবং চুল পড়া কমাতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও যত্নের টিপস সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
হরমোনের প্রভাব ও টেলোজেন এফ্লুভিয়াম চুলের বৃদ্ধি তিনটি পর্যায়ে ঘটে: অ্যানাজেন (বৃদ্ধি), ক্যাটাজেন (সংক্রমণ), এবং টেলোজেন (বিশ্রাম)।
- গর্ভাবস্থায়: এই সময়ে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা চরম পর্যায়ে থাকে। উচ্চ ইস্ট্রোজেন সাধারণত যে চুলগুলো টেলোজেন ধাপে বিশ্রাম নেওয়ার কথা ছিল, সেগুলোকে অ্যানাজেন (বৃদ্ধি) পর্যায়ে ধরে রাখে। ফলে চুল কম পড়ে এবং ঘন দেখায়।
- প্রসব পরবর্তী: প্রসবের পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় নেমে আসে। এই আকস্মিক পতন সেই সমস্ত চুলকে যা এত দিন জোর করে অ্যানাজেন ধাপে ছিল একযোগে টেলোজেন (বিশ্রাম) ধাপে ঠেলে দেয়। এর ২ থেকে ৪ মাস পর, যখন নতুন চুল গজানো শুরু হয়, তখন একবারে প্রচুর চুল ঝরে যায়। এটি কোনো রোগ নয়, বরং একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
চুল পড়া কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ
পোস্টপার্টাম চুল পড়া অনিবার্য হলেও, সঠিক পুষ্টি এবং যত্নের মাধ্যমে চুলকে শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যকর রাখা সম্ভব।
যা খাবেন:
১. আয়রন ও ফোলেট: প্রসবের সময় রক্তক্ষয় হয়, যা রক্তাল্পতার কারণ হতে পারে এবং চুল পড়া বাড়ায়। আয়রন এবং ফোলেট (ভিটামিন B9) চুলের ফলিকলকে সুস্থ রাখে।
- উৎস: লাল মাংস, পালং শাক, ডাল, ব্রোকলি।
২. প্রোটিন: চুল কেরাটিন নামক প্রোটিন দিয়ে তৈরি। পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ চুলের নতুন বৃদ্ধিকে সমর্থন করে।
- উৎস: ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ছোলা।
৩. বায়োটিন (Biotin) ও জিঙ্ক (Zinc): এই দুটি উপাদান চুলের গঠন এবং কোষের উৎপাদনে সরাসরি সাহায্য করে।
- উৎস: বাদাম, বীজ, ডিমের কুসুম, ওটস।
৪. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: এটি স্ক্যাল্পের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং শুষ্কতা কমায়।
- উৎস: তৈলাক্ত মাছ, আখরোট, ফ্ল্যাক্সসিড।
যা করবেন না:
১. তাপীয় স্টাইলিং (Heat Styling): হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেটনার বা কার্লিং আয়রন ব্যবহার করা এড়িয়ে চলুন, কারণ তাপ চুলকে দুর্বল করে তোলে।
২. কড়া রাসায়নিক: এই সময়ে হেয়ার কালার বা পার্মের মতো কঠোর রাসায়নিক ব্যবহার না করাই ভালো।
৩. টানটান চুলের বাঁধন: টাইট করে পনিটেল বা খোপা বাঁধলে চুলের গোড়ায় চাপ পড়ে (ট্র্যাকশন অ্যালোপেসিয়া), যা চুল পড়া বাড়ায়।
যত্নের টিপস:
- মৃদু শ্যাম্পু: চুল ধোয়ার সময় আলতোভাবে ম্যাসাজ করুন এবং অ্যান্টি-ব্রেকজ শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।
- চুল আঁচড়ানো: ভিজে চুল আঁচড়ানো এড়িয়ে চলুন। মোটা দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন।
- থাইরয়েড পরীক্ষা: যদি চুল পড়া ৬-১২ মাস পরও না থামে, তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। প্রসবের পর থাইরয়েডের সমস্যা (Postpartum Thyroiditis) চুল পড়ার একটি কারণ হতে পারে।
পোস্টপার্টাম হেয়ার ফল একটি সাময়িক সমস্যা এবং বেশিরভাগ মায়ের ক্ষেত্রে এটি শিশুর প্রথম জন্মদিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়। ধৈর্য ধরুন, পুষ্টিতে মনোযোগ দিন এবং স্বাস্থ্যকর উপায়ে আপনার চুলকে যত্ন নিন।
রেফারেন্স লিঙ্ক:





