জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানো, ভারী ওজন তোলা, এর সবই বৃথা হয়ে যেতে পারে যদি আপনার খাদ্যাভ্যাস ঠিক না থাকে। পেশি গঠনের ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে: “পেশি জিমে তৈরি হয় না, পেশি তৈরি হয় রান্নাঘরে।” এর অর্থ হলো, ব্যায়াম আপনার পেশিকে উদ্দীপিত করে (ক্ষতিগ্রস্ত করে), কিন্তু সেই পেশিকে মেরামত করতে এবং আকারে বড় করতে (Build) যা প্রয়োজন, তা আসে আপনার খাবার বা পুষ্টি থেকে। যারা জিমে যান, তাদের জন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন এবং সুনির্দিষ্ট একটি ডায়েট প্ল্যান প্রয়োজন। পেশি গঠনের এই ডায়েটের মূল ভিত্তি হলো তিনটি ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা প্রধান পুষ্টি উপাদান: প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাট।
পেশি গঠনে তিনটি প্রধান স্তম্ভ:
১. প্রোটিন (পেশির প্রধান গাঠনিক উপাদান): পেশি গঠনের কথা উঠলেই প্রথমে আসে প্রোটিনের নাম।
- কেন প্রয়োজন: আমাদের পেশি ‘অ্যামিনো অ্যাসিড’ নামক অণু দিয়ে তৈরি, আর এই অ্যামিনো অ্যাসিডের উৎস হলো প্রোটিন। যখন আমরা ব্যায়াম করি, তখন পেশিতে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ফাটল (Micro-tears) তৈরি হয়। প্রোটিন সেই ফাটলগুলো মেরামত করে। এই মেরামত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পেশি আগের চেয়ে বড় এবং শক্তিশালী হয়। যদি শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকে, তবে শরীর এই মেরামত কাজটি করতে পারে না, ফলে পেশির বৃদ্ধিও হয় না।
সেরা উৎস:- প্রাণিজ: মুরগির বুকের মাংস (Chicken Breast), মাছ (যেকোনো ধরনের), ডিম (সম্পূর্ণ ডিম), দুধ, টক দই, ছানা বা পনির।
- উদ্ভিজ্জ: বিভিন্ন প্রকার ডাল, ছোলা, রাজমা, সয়াবিন, টফু।
- সাপ্লিমেন্ট: জিমে যারা কঠোর পরিশ্রম করেন, তারা অনেক সময় খাবারের মাধ্যমে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে ‘হুই প্রোটিন’ (Whey Protein) একটি সুবিধাজনক এবং দ্রুত শোষণকারী বিকল্প হতে পারে (তবে এটি আবশ্যক নয়)।
- কতটুকু খাবেন: সারাদিনের খাবারকে ভাগ করে প্রতি প্রধান খাবারে (সকাল, দুপুর, রাত) যেন একটি ভালো প্রোটিন উৎস থাকে তা নিশ্চিত করুন।
২. কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা (ব্যায়ামের জ্বালানি): অনেকেই পেশি গঠনের সময় চর্বি কমানোর জন্য কার্বোহাইড্রেট বা ভাত-রুটি খাওয়া কমিয়ে দেন, যা একটি বড় ভুল।
- কেন প্রয়োজন: কার্বোহাইড্রেট হলো জিমে ভারী ওজন তোলার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির প্রধান উৎস। এটি আমাদের শরীরে ‘গ্লাইকোজেন’ হিসেবে পেশিতে জমা থাকে। যখন আপনার পেশিতে পর্যাপ্ত গ্লাইকোজেন থাকে, আপনি তীব্রভাবে ব্যায়াম করতে পারেন। কার্বোহাইড্রেটের অভাবে আপনি জিমে দুর্বল বোধ করবেন এবং ঠিকমতো ব্যায়াম করতে পারবেন না।
- সেরা উৎস (জটিল শর্করা): ওটস, লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, মিষ্টি আলু, আলু, কুইনোয়া এবং ফলমূল (যেমন- কলা)।
- এড়িয়ে চলুন: সাদা চিনি, ময়দা, কোমল পানীয়ের মতো সরল শর্করা।
৩. স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বা চর্বি (হরমোনের সহায়ক): ফ্যাট বা চর্বিকে অনেকেই শত্রু মনে করেন, কিন্তু স্বাস্থ্যকর ফ্যাট পেশি গঠনের জন্য অপরিহার্য।
- কেন প্রয়োজন: স্বাস্থ্যকর ফ্যাট শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টকে সচল রাখে এবং প্রদাহ কমায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি ‘টেস্টোস্টেরন’ এর মতো অ্যানাবলিক হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে, যা পেশি বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
- সেরা উৎস: কাঠবাদাম, আখরোট, চিয়া সিড, তিসির বীজ, অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো, ডিমের কুসুম এবং তৈলাক্ত মাছ (ইলিশ, স্যামন)।
খাবারের সময় (Meal Timing):
- ব্যায়ামের আগে (Pre-Workout): জিমের ১-২ ঘণ্টা আগে জটিল শর্করা এবং অল্প প্রোটিনের মিশ্রণ (যেমন: ওটস ও দুধ, বা লাল আটার রুটি ও ডিম) খেলে তা আপনাকে ব্যায়ামের শক্তি জোগাবে।
- ব্যায়ামের পরে (Post-Workout): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ব্যায়ামের ৩০-৬০ মিনিটের মধ্যে দ্রুত শোষণকারী প্রোটিন (যেমন: হুই প্রোটিন বা সেদ্ধ ডিম) এবং কিছু সরল শর্করা (যেমন: কলা বা আলু) গ্রহণ করলে তা পেশিকে দ্রুত মেরামত করতে এবং গ্লাইকোজেন পুনরায় পূরণ করতে সাহায্য করে।
পেশি গঠন একটি ধৈর্যশীল প্রক্রিয়া। এর জন্য তিনটি জিনিস একসাথে প্রয়োজন: সুশৃঙ্খল ব্যায়াম, সঠিক পুষ্টি (প্রোটিন, কার্বস ও ফ্যাটের ভারসাম্য) এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম (ঘুম)। জিমে আপনি যতই পরিশ্রম করুন না কেন, আপনার প্লেট যদি সঠিক পুষ্টিতে ভরপুর না থাকে, তবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া প্রায় অসম্ভব।





