বয়ঃসন্ধিকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মুখে, বিশেষ করে থুতনি, চোয়াল এবং গলায় বারবার ব্রণ হয়, তবে তার পেছনে প্রায় নিশ্চিতভাবে হরমোনের প্রভাব রয়েছে। এই ব্রণগুলো সাধারণত বেদনাদায়ক হয় এবং মাসিক চক্রের আগে বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) এর মতো হরমোনজনিত সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। ক্রিম বা ফেসওয়াশ ব্যবহার করেও যখন ব্রণ নিয়ন্ত্রণে আসে না, তখন বুঝতে হবে এর সমাধান ত্বকের গভীরে, অর্থাৎ শরীরের ভেতরের হরমোনের ভারসাম্য এবং খাদ্যাভ্যাসে লুকিয়ে আছে।
হরমোন কীভাবে ব্রণ তৈরি করে?
হরমোনাল ব্রণ প্রধানত দুটি কারণে ঘটে:
১. অ্যান্ড্রোজেনের আধিক্য: টেস্টোস্টেরনের মতো অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে সিবেসিয়াস গ্ল্যান্ড (তেল গ্রন্থি) থেকে অতিরিক্ত সিবাম বা তেল নিঃসৃত হয়। এই অতিরিক্ত তেল ত্বকের ছিদ্রগুলো আটকে দেয়।
২. ইনসুলিন স্পাইক: উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার খেলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা দ্রুত বাড়ে। এই ইনসুলিন লিভারকে এমন কিছু প্রোটিন তৈরি করতে উৎসাহিত করে যা অ্যান্ড্রোজেনের কার্যকলাপ বাড়িয়ে দেয়, ফলে তেল উৎপাদন বাড়ে এবং ব্রণ তৈরি হয়। হরমোনাল ব্রণ মাসিক শুরু হওয়ার ১-২ সপ্তাহ আগে বেশি হয়, কারণ এই সময়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন কমে গিয়ে অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাব বেড়ে যায়।
হরমোনাল ব্রণের ডায়েট
হরমোনাল ব্রণ নিয়ন্ত্রণের মূলনীতি হলো ইনসুলিনকে স্থিতিশীল রাখা এবং শরীরে প্রদাহ কমানো।
যা খাবেন:
১. লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) খাবার: এই খাবারগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ায়, ফলে ইনসুলিনের স্পাইক কম হয়।
- উৎস: হোল গ্রেইন (লাল আটা, ওটস), ফল (বেরি), সবজি, এবং ডাল।
২. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: এর শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণাগুণ রয়েছে, যা ত্বকের প্রদাহ (লালচে ভাব) এবং ব্রণের তীব্রতা কমায়।
- উৎস: তৈলাক্ত মাছ (স্যামন, ইলিশ), আখরোট, চিয়া বীজ।
৩. জিঙ্ক (Zinc): জিঙ্ক একটি শক্তিশালী মিনারেল যা হরমোন নিয়ন্ত্রণ এবং ব্রণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের দ্রুত নিরাময়েও সহায়তা করে।
- উৎস: কুমড়োর বীজ, ছোলা, মুরগির মাংস।
৪. প্রোবায়োটিক: স্বাস্থ্যকর অন্ত্র বা হজম ব্যবস্থা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- উৎস: টক দই, দইয়ের ঘোল (বাটারমিল্ক)।
যা খাবেন না:
১. উচ্চ গ্লাইসেমিক লোড খাবার: সাদা রুটি, সাদা ভাত, ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার, কেক, মিষ্টি পানীয় ইনসুলিন স্পাইক ঘটায়। এগুলো এড়িয়ে চলুন।
২. অতিরিক্ত দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে স্কিমড মিল্ক (Skimmed milk) ব্রণের জন্য দায়ী হরমোনগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি দুধ খাওয়ার পর ব্রণ বাড়ে, তবে কয়েক সপ্তাহ দুধ বাদ দিয়ে দেখুন।
৩. ট্রান্স ফ্যাট ও অস্বাস্থ্যকর তেল: ফাস্ট ফুড, চিপস এবং ভাজা-পোড়া খাবার শরীরের প্রদাহ বাড়ায়, যা ব্রণকে আরও খারাপ করে তোলে।
ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
- ঔষধ: খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি ব্রণের তীব্রতা অনুযায়ী স্পাইরোনোল্যাকটোন (Spironolactone- অ্যান্ড্রোজেন বিরোধী ওষুধ) বা ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল ব্যবহার করার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- পর্যাপ্ত ঘুম: ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে।
- ফেসিয়াল রুটিন: মুখের ত্বক দিনে দুবার মৃদু ক্লিনজার দিয়ে পরিষ্কার করুন। ব্রণ খোঁটা বা চাপাচাপি করবেন না।
হরমোনাল ব্রণ একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যা নিয়ন্ত্রণ করতে অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য প্রয়োজন। লো-জিআই ডায়েট অনুসরণ, প্রদাহ কমানো এবং সঠিক ত্বকের যত্নের মাধ্যমে আপনি ধীরে ধীরে ব্রণ মুক্ত ত্বক ফিরে পেতে পারেন।
রেফারেন্স লিঙ্ক:





