বাংলাদেশে শীতকালে অ্যাজমার উপসর্গ সাধারণত বেড়ে যায়। কারণ শীতের সকালে বাতাস ঠান্ডা এবং শুষ্ক থাকে যা শ্বাসনালীর পেশীকে সংকুচিত করে। এই সংকোচন অ্যাজমার প্রধান ট্রিগারের একটি। ঠান্ডা বাতাস ফুসফুসের ভেতরের পথকে উত্তেজিত করে এবং হুইজিং কাশি ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ায়।
শীতকালে বাতাসে ধুলাবালি বেশি থাকে। রাস্তাঘাট নির্মাণ যানবাহনের ধোঁয়া এবং বাতাসের দূষণ শ্বাসনালীকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। ধুলাবালি শুধু অ্যালার্জি বাড়ায় না বরং অ্যাজমার অ্যাটাককেও তীব্র করে। এই সময় ভাইরাসজনিত সর্দি কাশি বেশি হয় যা অ্যাজমার রোগীদের উপসর্গ বাড়ানোর বড় কারণ।
সকালের সময় তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। এই কম তাপমাত্রায় ঠান্ডা বাতাস হঠাৎ ফুসফুসে ঢুকলে শরীর প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং শ্বাসনালীর পেশী শক্ত হয়ে যায়। এজন্য অনেক রোগী সকালবেলায় বেশি কষ্ট অনুভব করেন। বাংলাদেশে যারা খোলা জায়গায় ব্যায়াম হাঁটা বা কাজে বের হন তারা এ সমস্যার মুখোমুখি বেশি হন।
শীতের সকালে অ্যাজমা রোগীদের জন্য করণীয়
- বাইরে বের হওয়ার আগে মুখ ও নাক ঢেকে নিন যাতে সরাসরি ঠান্ডা বাতাস ফুসফুসে না ঢোকে।
- ইনহেলার বা রেসকিউ মেডিসিন নিয়মিত চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করুন।
- ঘর গরম রাখুন এবং খুব ভোরে বাইরে বের হওয়া এড়িয়ে চলুন। তুলনামূলক উষ্ণ সময়ে বের হওয়া নিরাপদ।
- ভাইরাসজনিত সংক্রমণ এড়াতে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং ভিড় এড়িয়ে চলা জরুরি।
- ধুলাবালি ও ধোঁয়াযুক্ত এলাকায় যাওয়া কমিয়ে দিন। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করুন।
- ঘর ধুলামুক্ত রাখুন। বিছানার চাদর ও পর্দা সপ্তাহে একবার পরিষ্কার করুন।
- সকালে ব্যায়াম করতে চাইলে ঘরের ভেতর হালকা ব্যায়াম করুন। খুব ঠান্ডা বাতাসে দৌড়ানো বা ভারী ব্যায়াম অ্যাজমা বাড়াতে পারে।
- অ্যাজমা অ্যাকশন প্ল্যান চিকিৎসকের কাছ থেকে লিখিতভাবে নিয়ে রাখুন যাতে কী করতে হবে তা পরিষ্কার থাকে।
অ্যাজমা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সহায়ক খাবার
অ্যাজমা নিরাময় করে এমন নির্দিষ্ট কোনো খাবার নেই। তবে পুষ্টিগুণ ও অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্যের কারণে কিছু খাবার অ্যাজমার উপসর্গ কমাতে বা ট্রিগার কমাতে সাহায্য করতে পারে। নিচের খাবারগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ও গবেষণায় উল্লেখ আছে।
- ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার
যেমন কমলা, লেবু, পেয়ারা, টমেটো ।
ভিটামিন সি শ্বাসনালির অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়। Mayo Clinic অনুযায়ী ভিটামিন সি ফুসফুসের immune response বাড়াতে সাহায্য করে।
- ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড
যেমন সামুদ্রিক মাছ, চিয়া বীজ, ফ্ল্যাক্সসিড ।
American Journal of Respiratory and Critical Care Medicine এ প্রকাশিত কিছু গবেষণায় ওমেগা থ্রি ফুসফুসের প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে বলা হয়েছে।
তবে এটি পর্যবেক্ষণমূলক, নিশ্চিত নয়।
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ সবজি
যেমন পালং শাক, ব্রোকলি, গাজর, লাল বিট ।
NIH অনুসারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শ্বাসনালির প্রদাহ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।
- ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার
যেমন বাদাম, কলা, পালং, কাজুবাদাম ।
European Respiratory Journal অনুযায়ী ম্যাগনেসিয়াম শ্বাসনালির মাংসপেশি শিথিল করতে পারে।
- আদা
আদার gingerol উপাদান প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে। Harvard Health Publishing আদাকে শ্বাসজনিত সমস্যায় সম্ভাব্য উপকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে নিশ্চিত চিকিৎসাগত প্রমাণ এখনও সীমিত।
- হলুদ
হলুদের কারকিউমিন প্রদাহ কমাতে সহায়ক। NIH এ প্রকাশিত গবেষণায় কারকিউমিনের immune support ভূমিকা উল্লেখ আছে, তবে অ্যাজমার সরাসরি চিকিৎসায় স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
- আপেল
আপেলের কুয়েরসেটিন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে শ্বাসনালির স্বাস্থ্য সাপোর্ট করতে পারে।
European Respiratory Journal এ একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় আপেল খাওয়ার সাথে ফুসফুসের উন্নত কার্যকারিতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে, কিন্তু এটি causal প্রমাণ নয়।
- প্রোবায়োটিক খাবার
যেমন দই, লাচ্ছি
প্রোবায়োটিক gut microbiome উন্নত করে যা ইমিউন সিস্টেমকে সাপোর্ট করে। WHO এবং NIH microbiome এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকৃত পেয়েছে।অ্যাজমায় সরাসরি প্রভাব সম্পর্কে যথেষ্ট শক্ত প্রমাণ নেই।
অ্যাজমার ট্রিগার হতে পারে এমন খাবার
- ঠান্ডা পানীয় ও আইসক্রিম
ঠান্ডা তাপমাত্রায় bronchoconstriction হতে পারে। CDC এ বিষয়ে সতর্ক করেছে।
- অতিরিক্ত লবণ
কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় লবণ প্রদাহ বাড়াতে পারে বলা হয়েছে। নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। - প্রক্রিয়াজাত খাবার
যেমন চিপস, সসেজ, প্রসেসড ফুড
American Lung Association অনুযায়ী sulfites এবং additives অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাজমা ট্রিগার করতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
- শ্বাস নিতে কষ্ট হলে ।
- রাতের ঘুম ব্যাহত হলে ।
- ইনহেলার ব্যবহার বাড়াতে হলে ।
- বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভব হলে ।
- ৩ দিনের বেশি কাশি থাকলে ।
এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সতর্কতা
- ইনহেলার ডোজ নিজে থেকে পরিবর্তন করবেন না ।
- ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ, হুইজিং হলে দ্রুত চিকিৎসাগত পরামর্শ নিন ।
- ঠান্ডায় হঠাৎ দৌড়াদৌড়ি বা ভারী ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকুন ।





