চল্লিশ বছর বয়সের পর আমাদের শরীর নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে আসে, পেশির পরিমাণ কমতে শুরু করে (সারকোপেনিয়া) এবং জয়েন্টগুলো শক্ত হতে থাকে। এই বয়সে এসে অনেকেই বুঝতে পারেন যে, বিশ বা ত্রিশের কোঠার মতো তীব্র শরীরচর্চা (High-impact exercise) করা সম্ভব হচ্ছে না বা করা উচিতও নয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, শরীরচর্চা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। চল্লিশের পর সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র হলো তীব্রতা নয়, বরং ধারাবাহিকতা। হাঁটা, যোগব্যায়াম এবং স্ট্রেচিং-এর মতো সহজ ও ‘লো-ইমপ্যাক্ট’ (Low-impact) ব্যায়ামই এই বয়সের জন্য সবচেয়ে উপকারী ও নিরাপদ।
কেন চল্লিশের পর এই সহজ ব্যায়ামগুলো জরুরি?
এই বয়সে এসে ভারী ব্যায়াম অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে, বিশেষ করে জয়েন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে ব্যথার কারণ হতে পারে। লো-ইমপ্যাক্ট ব্যায়ামগুলো শরীরের ওপর চাপ না ফেলেই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে, পেশির নমনীয়তা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমায়।
১. হাঁটা (Walking): সর্বোত্তম ব্যায়াম হাঁটাকে বলা হয় ‘ইউনিভার্সাল এক্সারসাইজ’ বা সার্বজনীন ব্যায়াম। চল্লিশের পর এর চেয়ে ভালো বন্ধু আর হয় না।
- উপকারিতা: এটি একটি চমৎকার কার্ডিও ওয়ার্কআউট। নিয়মিত brisk walking বা দ্রুত গতিতে হাঁটা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এটি হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে (অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ) এবং মেটাবলিজম বাড়িয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। পাশাপাশি, খোলা বাতাসে হাঁটলে মানসিক প্রশান্তি আসে এবং ঘুমের মান উন্নত হয়।
- কীভাবে করবেন: প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ মিনিট দ্রুত গতিতে হাঁটার লক্ষ্য রাখুন। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন হাঁটা জরুরি। হাঁটার জন্য ভালো মানের জুতো ব্যবহার করুন। হাঁটার গতি এমন হবে যেন আপনি হালকা ঘামছেন, কিন্তু কথা বলতে পারছেন।
২. যোগব্যায়াম (Yoga): শরীর ও মনের সংযোগ চল্লিশের পর যোগব্যায়াম শুধু একটি ব্যায়াম নয়, এটি একটি জীবনধারা। এটি শরীরকে নমনীয় করার পাশাপাশি মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
- উপকারিতা: যোগব্যায়াম শরীরের নমনীয়তা (Flexibility) এবং ভারসাম্য (Balance) বাড়ায়, যা এই বয়সে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমায়। এটি কোর (Core) বা পেটের পেশিকে শক্তিশালী করে, যা পিঠের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। বিভিন্ন আসন (যেমন- ভুজঙ্গাসন, পবনমুক্তাসন) হজমশক্তি বাড়ায়। সবচেয়ে বড় কথা, প্রাণায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা কমাতে জাদুকরি ভূমিকা রাখে।
- কীভাবে করবেন: একজন প্রশিক্ষকের কাছে প্রাথমিক বিষয়গুলো শিখে নেওয়া ভালো। তবে ঘরে বসেই সহজ কিছু আসন যেমন—সূর্য নমস্কার (Surya Namaskar), তাডাসন (Mountain Pose), বালাসন (Child’s Pose) এবং শবাসন (Corpse Pose) দিয়ে শুরু করতে পারেন।
৩. স্ট্রেচিং (Stretching): নমনীয়তা ও আরাম বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের পেশি ও টেন্ডনগুলো শক্ত এবং খাটো হতে শুরু করে, যার ফলে শরীরে ব্যথা বা টান লাগার প্রবণতা বাড়ে।
- উপকারিতা: নিয়মিত স্ট্রেচিং পেশিকে নমনীয় রাখে, জয়েন্টের সচলতা (Range of motion) বাড়ায় এবং শরীরে রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে। এটি ব্যায়ামের আগে শরীরকে প্রস্তুত করে এবং ব্যায়ামের পরে পেশিকে দ্রুত সেরে উঠতে (Recovery) সাহায্য করে। চল্লিশের পর পিঠ, ঘাড় ও কাঁধের ব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা, যা নিয়মিত স্ট্রেচিং-এর মাধ্যমে দূর করা সম্ভব।
- কীভাবে করবেন: প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বা রাতে ঘুমানোর আগে ১০-১৫ মিনিট সময় দিন। ঘাড়, কাঁধ, হাত, কোমর এবং পায়ের পেশিগুলো আলতোভাবে স্ট্রেচ করুন। প্রতিটি স্ট্রেচ ১৫-৩০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। মনে রাখবেন, স্ট্রেচিং-এ কোনো ব্যথা লাগা উচিত নয়, কেবল আরামদায়ক টান অনুভূত হবে।
চল্লিশের পর ফিটনেস মানে সিক্স প্যাক অ্যাবস নয়, ফিটনেস মানে হলো একটি ব্যথামুক্ত, সচল এবং কর্মক্ষম শরীর। হাঁটা, যোগব্যায়াম এবং স্ট্রেচিং এই তিনটির সমন্বয়ে একটি রুটিন তৈরি করুন। শুরুটা অল্প সময় দিয়ে করুন, কিন্তু ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন। আপনার শরীর অবশ্যই এর প্রতিদান দেবে।





