ক্রনিক পেলভিক পেইন বা দীর্ঘমেয়াদী তলপেটে ব্যথা এমন একটি অবস্থা যখন একজন নারী তলপেটে বা পিঠের নিচের দিকে একটানা ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে ব্যথা অনুভব করেন। মাসিক, যৌন মিলন, প্রস্রাব বা মলত্যাগের সময় এই ব্যথা আরও বেড়ে যেতে পারে। এই সমস্যা শুধু শারীরিক নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। যেহেতু এই ব্যথার কারণ বহুবিধ হতে পারে (একটির বেশি কারণ প্রায়শই জড়িত থাকে), তাই এর সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা পদ্ধতি জটিল। তবে সঠিক জীবনযাত্রা, খাদ্য পরিবর্তন এবং একটি বহু-বিভাগীয় চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে এই ব্যথা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদী ব্যথার জটিলতা পেলভিক পেইন যখন ছয় মাস ধরে চলতে থাকে, তখন এটি আর শুধু কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ থাকে না। এই সময় ব্যথার সংকেতগুলো মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুপথ তৈরি করে। ফলে স্নায়ুতন্ত্র অতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং কোনো ছোট উদ্দীপনাও তীব্র ব্যথার সৃষ্টি করে। ক্রনিক পেলভিক পেইনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis): জরায়ুর বাইরে টিস্যুর বৃদ্ধি।
- ফাইব্রয়েড (Uterine Fibroids): জরায়ুতে টিউমার।
- ইন্টারস্টিশিয়াল সিস্টাইটিস (Interstitial Cystitis): মূত্রাশয়ের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ।
- ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS): হজমের সমস্যা।
- পেটের পেশীর সমস্যা: পেলভিক ফ্লোরের পেশি অতিরিক্ত টাইট বা দুর্বল হওয়া।
ব্যথা কমাতে ডায়েট ও লাইফস্টাইল
দীর্ঘমেয়াদী ব্যথার ব্যবস্থাপনায় অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যা খাবেন:
১. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: এটি শরীরের প্রদাহ (Inflammation) কমাতে সবচেয়ে কার্যকরী। এন্ডোমেট্রিওসিস বা অন্যান্য প্রদাহজনিত কারণে ব্যথা হলে এটি অপরিহার্য।
- উৎস: তৈলাক্ত মাছ (স্যামন, ইলিশ), আখরোট, চিয়া বীজ এবং তিসির বীজ।
২. উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার: যদি ব্যথা IBS বা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে হয়, তবে ফাইবার পাচনতন্ত্রকে সচল রাখে এবং চাপ কমায়।
- উৎস: হোল গ্রেইন, ডাল, ফল এবং সবজি।
৩. জল ও হার্বাল চা: প্রচুর পানি পান ডিহাইড্রেশন এবং মূত্রাশয়ের জ্বালা কমায়। আদা বা হলুদের চা প্রাকৃতিক প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে।
৪. ম্যাগনেসিয়াম: পেশি শিথিল করতে সাহায্য করে এবং ক্র্যাম্প কমাতে পারে।
- উৎস: গাঢ় সবুজ শাক, কুমড়োর বীজ, অ্যাভোকাডো।
যা খাবেন না:
১. অতিরিক্ত চিনি এবং সরল শর্করা: চিনি শরীরে প্রদাহ বাড়ায় এবং ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে, যা এন্ডোমেট্রিওসিস বা ফাইব্রয়েডের ব্যথা বাড়ায়।
২. ট্রান্স ফ্যাট এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট: ভাজা-পোড়া খাবার এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস শরীরে প্রো-ইনফ্ল্যামেটরি যৌগ তৈরি করে।
৩. ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল: এই দুটিই মূত্রাশয়ের জন্য উত্তেজক হতে পারে, যা ইন্টারস্টিশিয়াল সিস্টাইটিসের মতো সমস্যায় ব্যথা বাড়ায়।
জীবনযাত্রার টিপস:
- শারীরিক থেরাপি: পেলভিক ফ্লোর ফিজিক্যাল থেরাপি অনেক সময় টেনশন বা মাসকুলোস্কেলিটাল কারণে হওয়া ব্যথা কমাতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।
- স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট: দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা মস্তিষ্কের ওপর চাপ ফেলে। যোগব্যায়াম, মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন বা ডিপ ব্রিদিং স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) কমায়।
- পর্যাপ্ত ঘুম: ঘুমের অভাব ব্যথা সংবেদনশীলতা বাড়ায়। রাতের বেলায় ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন।
ক্রনিক পেলভিক পেইন মোকাবিলা করার জন্য ধৈর্য প্রয়োজন। আপনার স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ (Gynaecologist), ফিজিওথেরাপিস্ট এবং পুষ্টিবিদের সম্মিলিত পরামর্শ গ্রহণ করে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে এই দীর্ঘমেয়াদী যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ফ্যাক্ট চেক ও রেফারেন্স লিঙ্ক:





