আর্থ্রাইটিস বা গাঁটে ব্যথা: কারণ, লক্ষণ, ধরন ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায়

আর্থ্রাইটিস বা গাঁটে ব্যথা: কারণ, লক্ষণ, ধরন ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায়

আর্থ্রাইটিস বা গাঁটে ব্যথা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সাধারণ রোগ যা মূলত হাড় ও জয়েন্টে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই রোগে আক্রান্ত হলে জয়েন্ট ফুলে যায়, ব্যথা করে এবং চলাফেরায় অসুবিধা হয়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে এর ঝুঁকি বাড়লেও এখন অনেক তরুণও এই সমস্যায় ভুগছেন অনিয়মিত জীবনযাপন স্থূলতা ও কাজের চাপের কারণে।

আর্থ্রাইটিস কী ?

Arthritis শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ Arthro অর্থাৎ জয়েন্ট বা গাঁট এবং Itis অর্থাৎ প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন থেকে। অর্থাৎ আর্থ্রাইটিস মানে হলো জয়েন্টে প্রদাহ ব্যথা ও ফুলে যাওয়ার অবস্থা।

আর্থ্রাইটিসের ধরন:

আর্থ্রাইটিসের ১০০টিরও বেশি ধরন আছে তবে সবচেয়ে সাধারণ কয়েকটি হলো
১. অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis): হাড়ের সংযোগস্থলে কার্টিলেজ ক্ষয়ে গিয়ে ঘর্ষণ তৈরি করে ফলে ব্যথা ও কড়াভাব দেখা দেয়।
২. রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid Arthritis): এটি একটি অটোইমিউন রোগ যেখানে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের জয়েন্টকে আক্রমণ করে।
৩. গাউট (Gout): শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা জয়েন্টে জমে ব্যথা সৃষ্টি করে।
৪. সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস (Psoriatic Arthritis): ত্বকের সোরিয়াসিস রোগের সঙ্গে যুক্ত একধরনের জয়েন্ট ইনফ্লামেশন।

আর্থ্রাইটিসের কারণ:

  • বয়স বৃদ্ধি
  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
  • দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কাজ করা
  • পূর্বের জয়েন্ট ইনজুরি
  • বংশগত কারণ
  • হরমোনজনিত বা অটোইমিউন সমস্যা
  • অনিয়মিত জীবনযাপন ও অস্বাস্থ্যকর খাবার

আর্থ্রাইটিসের সাধারণ লক্ষণ:

  • জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা
  • জয়েন্টে শক্তভাব বা কড়াভাব বিশেষত সকালে
  • নড়াচড়া করতে কষ্ট
  • জয়েন্টে উষ্ণতা বা লালচে ভাব
  • ক্লান্তি ও দুর্বলতা

চিকিৎসা প্রতিকার:

আর্থ্রাইটিস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
১. চিকিৎসকের পরামর্শ: রিউমাটোলজিস্ট বা অর্থোপেডিক চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ করুন।
২. ব্যায়াম: হালকা ব্যায়াম সাঁতার বা হাঁটা জয়েন্ট নমনীয় রাখে।
৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ওজন কমালে জয়েন্টে চাপ কমে।
৪. ফিজিওথেরাপি: জয়েন্টের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
৫. গরম ঠান্ডা সেঁক: ব্যথা ও ফোলাভাব কমাতে কার্যকর।
৬. পুষ্টিকর খাবার: মাছ বাদাম ফল সবুজ শাকসবজি ও ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার উপকারী।

যেসব খাবার এড়িয়ে চলা উচিত:

  • অতিরিক্ত লবণ ও তেলযুক্ত খাবার
  • চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
  • লাল মাংস
  • কোল্ড ড্রিংক ও জাঙ্ক ফুড

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

আর্থ্রাইটিসে শরীরে প্রদাহজনক রাসায়নিক Inflammatory Cytokines বৃদ্ধি পায় যা জয়েন্টের কার্টিলেজ ক্ষয় করে। ফলস্বরূপ হাড় একে অপরের সঙ্গে ঘর্ষণ করে ব্যথা ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে ইমিউন সিস্টেম ভুলবশত নিজ শরীরের জয়েন্টকে বিদেশি শত্রু হিসেবে আক্রমণ করে ফলে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হয়।

প্রতিরোধের উপায়:

  • নিয়মিত ব্যায়াম ও সঠিক ওজন বজায় রাখা
  • পর্যাপ্ত পানি পান করা
  • ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার
  • পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া
  • জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া

আর্থ্রাইটিস একটি সাধারণ কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা ও সচেতন জীবনযাপনই পারে ব্যথা ও জটিলতা কমাতে। নিয়মিত ব্যায়াম সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখলে আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

Scroll to Top