জরায়ু বা ইউটেরাসে সৃষ্ট ফাইব্রয়েড (Uterine Fibroids) হলো এমন একটি সমস্যা যা নারীদের মধ্যে বেশ প্রচলিত। এগুলি হলো জরায়ুর পেশী এবং তন্তুময় টিস্যু থেকে তৈরি হওয়া অ-ক্যানসারজনিত টিউমার বা পিণ্ড। যদিও বেশিরভাগ ফাইব্রয়েডই নিরীহ, তবে এর আকার এবং অবস্থানের কারণে এটি মাসিক চক্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন অতিরিক্ত রক্তপাত (মেনোরেজিয়া), পেলভিক অঞ্চলে চাপ বা ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ এবং কখনও কখনও বন্ধ্যাত্ব। ফাইব্রয়েডের সঠিক কারণ এখনও সম্পূর্ণরূপে জানা যায়নি, তবে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোন এদের বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই কারণে জীবনযাত্রায় ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা ফাইব্রয়েড ব্যবস্থাপনার একটি অপরিহার্য অংশ।
ফাইব্রয়েড এবং হরমোনের সম্পর্ক ফাইব্রয়েডগুলো ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের উপস্থিতিতে বাড়ে। মেনোপজের পর যখন হরমোনের মাত্রা কমে যায়, তখন ফাইব্রয়েডগুলো সাধারণত সংকুচিত হয়। এর মানে হলো, ফাইব্রয়েড বৃদ্ধির সাথে শরীরে ইস্ট্রোজেন ডমিন্যান্স (Estrogen Dominance) বা প্রদাহের একটি সম্পর্ক থাকতে পারে।
- ইস্ট্রোজেন ডমিন্যান্স: যখন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা প্রোজেস্টেরনের তুলনায় অতিরিক্ত বেড়ে যায়।
- ভিটামিন ডি ঘাটতি: গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি-এর অভাবে ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ভিটামিন ডি ফাইব্রয়েড কোষের বৃদ্ধিকে রোধ করতে সাহায্য করে।
ফাইব্রয়েডের প্রধান লক্ষণ:
- অতিরিক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী মাসিক রক্তপাত (যা রক্তশূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে)।
- তলপেটে চাপ, ফোলা ভাব বা ব্যথা।
- সহবাসের সময় ব্যথা।
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ (মূত্রাশয়ের উপর চাপের কারণে)।
চিকিৎসকের পরামর্শ: ফাইব্রয়েড নিয়ন্ত্রণে ডায়েট
খাদ্যতালিকায় কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন এনে শরীরে অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেনের নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
যা খাবেন:
১. উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার: ফাইবার অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেনকে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। ইস্ট্রোজেন লিভার দ্বারা ভেঙে যাওয়ার পর পাচনতন্ত্রের মাধ্যমে নির্গত হয়। ফাইবার এই প্রক্রিয়াকে দ্রুত করে।
উৎস: হোল গ্রেইন, ওটস, ফল (আপেল, নাশপাতি), এবং সবজি।
২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার: সবুজ শাকসবজি, ফল এবং রঙিন সবজিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জরায়ুতে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
উৎস: ব্রকলি, পালং শাক, টমেটো, বেরি ফল।
৩. ভিটামিন ডি: ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট ফাইব্রয়েড কোষের বৃদ্ধিকে বাধা দিতে পারে।
উৎস: সূর্যের আলো, তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম, এবং ডাক্তারের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট।
৪. পটাসিয়াম: উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে, যা ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি কমাতে পরোক্ষ ভূমিকা রাখে।
উৎস: কলা, মিষ্টি আলু, অ্যাভোকাডো।
যা খাবেন না:
১. রেড মিট (Red Meat): কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত লাল মাংস খেলে ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এটি ইস্ট্রোজেন ও অন্যান্য হরমোনকে প্রভাবিত করতে পারে।
২. অতিরিক্ত চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট: এগুলো রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ায়, যা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে।
৩. অ্যালকোহল: অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়ায় এবং ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
৪. উচ্চ চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত পণ্য: এগুলোতে স্টেরয়েড হরমোন থাকতে পারে, যা শরীরের হরমোনের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। লো-ফ্যাট বিকল্প বেছে নিন।
চিকিৎসা ও করণীয়:
- অ্যানিমিয়া মোকাবিলা: অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে রক্তশূন্যতা হলে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ: স্থূলতা শরীরের ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়ায়। ওজন নিয়ন্ত্রণ ফাইব্রয়েড বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করে।
- নিয়মিত চেক-আপ: ফাইব্রয়েডের আকার এবং লক্ষণগুলির ওপর ভিত্তি করে ডাক্তাররা বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির পরামর্শ দিতে পারেন, যেমন ওষুধ, মায়োমেকটমি (Myomectomy) বা ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড এম্বোলাইজেশন (Uterine Fibroid Embolization)।
ফাইব্রয়েড একটি সাধারণ সমস্যা হলেও, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং খাদ্য ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে এর লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অতিরিক্ত রক্তপাত বা দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা হলে দ্রুত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
রেফারেন্স লিঙ্ক:





