পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) নিয়ন্ত্রণ: খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার মাধ্যমে প্রতিকার

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) নিয়ন্ত্রণ: খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার মাধ্যমে প্রতিকার

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস (PCOS) বর্তমানে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হরমোনজনিত সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি। এটি শুধু একটি গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যা নয়, বরং এটি একটি মেটাবলিক বা বিপাকীয় সিনড্রোম, যা পুরো শরীরকে প্রভাবিত করে। পিসিওএস এর মূল লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত মাসিক, মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম, ব্রণ, চুল পড়া এবং ওজন বৃদ্ধি (বিশেষ করে পেটে মেদ জমা)। অনেক নারীই এই সমস্যায় ভুগে হতাশ হয়ে পড়েন। যদিও পিসিওএস এর কোনো স্থায়ী “নিরাময়” নেই, তবে একটি সুসংবাদ হলো শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিকল্পিত পরিবর্তন এনে এই সিনড্রোমের বেশিরভাগ উপসর্গকেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

পিসিওএস এর মূল কারণ

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স পিসিওএস এর বেশিরভাগ উপসর্গের মূলে রয়েছে ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ নামক একটি অবস্থা। ইনসুলিন হলো একটি হরমোন যা আমাদের খাওয়া শর্করাকে কোষে শক্তি হিসেবে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হলে শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি সঠিকভাবে সাড়া দেয় না। ফলে রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত ইনসুলিন ডিম্বাশয়কে (Ovary) উদ্দীপিত করে অতিরিক্ত পুরুষ হরমোন (অ্যান্ড্রোজেন) তৈরি করতে, যা মাসিকের অনিয়ম, ব্রণ এবং অন্যান্য উপসর্গ সৃষ্টি করে। তাই পিসিওএস নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হলো এই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমানো এবং হরমোনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।

১. পিসিওএস নিয়ন্ত্রণের খাদ্যাভ্যাস (ডায়েট) পিসিওএস এর ডায়েট মানে না খেয়ে থাকা নয়, বরং ‘সঠিক’ খাবারটি বেছে নেওয়া।

  • ‘খারাপ’ শর্করা বাদ দিন, ‘ভালো’ শর্করা গ্রহণ করুন:
    • এড়িয়ে চলুন (সরল শর্করা): চিনি (সরাসরি বা পানীয়তে), কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, সাদা চাল, সাদা আটা (ময়দা), কেক, বিস্কুট এবং বেকারি পণ্য। এগুলো রক্তে খুব দ্রুত শর্করা বাড়িয়ে ইনসুলিন স্পাইক ঘটায়।
    • গ্রহণ করুন (জটিল শর্করা): লাল চাল, লাল আটা (হোল গ্রেইন), ওটস, বার্লি, কুইনোয়া। এগুলোতে ফাইবার থাকায় এগুলো ধীরে ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করা স্থিতিশীল রাখে।
  • প্রোটিনকে অগ্রাধিকার দিন:
    • প্রতিবেলার খাবারে প্রোটিন রাখুন। প্রোটিন দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং রক্তে শর্করার ওপর খুব কম প্রভাব ফেলে।
    • উৎস: মাছ, মুরগির মাংস (বিশেষ করে বুকের অংশ), ডিম, ডাল, ছোলা, রাজমা, টক দই, পনির বা ছানা।
  • ফাইবার (আঁশ) সমৃদ্ধ খাবার বাড়ান:
    • ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমাতে সাহায্য করে।
    • উৎস: প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, সালাদ (শসা, টমেটো, গাজর), খোসা সহ ফল (যেমন- পেয়ারা, আপেল, বেরি), ইসবগুলের ভুসি।
  • স্বাস্থ্যকর ফ্যাটকে ভয় পাবেন না:
    • ভালো ফ্যাট হরমোনের ভারসাম্য এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
    • উৎস: কাঠবাদাম, আখরোট, তিসির বীজ (Flaxseed এটি পিসিওএস এর জন্য বিশেষভাবে উপকারী), অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো, মাছের তেল।

২. জীবনযাত্রা ও শরীরচর্চা (ব্যায়াম) খাবারের পাশাপাশি ব্যায়াম পিসিওএস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

  • কেন ব্যায়াম জরুরি: ব্যায়াম শরীরের কোষগুলোকে ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে তোলে, অর্থাৎ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সরাসরি কমিয়ে দেয়। এটি ওজন কমাতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
  • কী ধরনের ব্যায়াম করবেন:
    • কার্ডিও: সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটা।
    • স্ট্রেন্থ ট্রেইনিং: সপ্তাহে ২-৩ দিন ওজন নিয়ে ব্যায়াম বা ডাম্বেল/বডি ওয়েট এক্সারসাইজ (স্কোয়াট, লাঞ্জেস) করুন। পেশি বাড়লে তা ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত করে।
    • যোগব্যায়াম (Yoga): কিছু নির্দিষ্ট যোগাসন (যেমন- প্রজাপতি আসন, সূর্য নমস্কার) পেলভিক অঞ্চলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমিয়ে হরমোনের ভারসাম্য ফেরাতে সাহায্য করে।

 অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ টিপস:

  • মানসিক চাপ কমানো: মানসিক চাপ ‘কর্টিসল’ হরমোন বাড়ায়, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আরও বাড়িয়ে দেয়। মেডিটেশন, পর্যাপ্ত ঘুম (৭-৮ ঘণ্টা) মানসিক চাপ কমাতে অপরিহার্য।
  • সঠিক সময়ে খান: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থেকে একবারে বেশি খাবেন না। সারাদিনে ৩টি প্রধান খাবারের পাশাপাশি ২টি হালকা নাস্তা খেতে পারেন।

পিসিওএস একটি দীর্ঘমেয়াদী অবস্থা হতে পারে, কিন্তু এটি আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। সঠিক ডায়েট, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের মাধ্যমে আপনি এর উপসর্গগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখে একটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

Scroll to Top