শীতে মন খারাপ লাগে? জেনে নিন ‘উইন্টার ব্লুজ’ বা শীতকালীন বিষণ্ণতা থেকে মুক্তির উপায়

শীতে মন খারাপ লাগে 'উইন্টার ব্লুজ' বা শীতকালীন বিষণ্ণতা থেকে মুক্তির উপায়

শীতকালে কি আপনার অকারণে মন খারাপ লাগে? সারাদিন ক্লান্তি ভর করে থাকে, কোনো কাজেই উৎসাহ পান না বা সারাদিন শুধু ঘুমোতে ইচ্ছে করে?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আপনি হয়তো ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’ (Seasonal Affective Disorder – SAD) বা সাধারণ ভাষায় ‘উইন্টার ব্লুজ’ এ ভুগছেন। এটি কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে দেখা দেয়। শীতে সূর্যের আলো কমে যাওয়ার সাথে আমাদের মনের গভীর সংযোগ রয়েছে।

শীতে কেন মন খারাপ হয়?

সূর্যের আলো আমাদের মস্তিষ্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিককে নিয়ন্ত্রণ করে।

১. সেরোটোনিন (Serotonin): এটি হলো ‘ফিল গুড’ হরমোন বা মন ভালো রাখার হরমোন। সূর্যের আলো সেরোটোনিন বাড়াতে সাহায্য করে। শীতে রোদ কম থাকায় সেরোটোনিনের মাত্রা কমে যায়, ফলে বিষণ্ণতা বা মনমরা ভাব দেখা দেয়।

২. মেলাটোনিন (Melatonin): এটি ঘুমের হরমোন। অন্ধকারে এর নিঃসরণ বাড়ে। শীতে দিন ছোট এবং রাত বড় হওয়ায় শরীরে মেলাটোনিনের উৎপাদন বেড়ে যায়। ফলে সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব ও আলসেমি লাগে।

৩. সার্কাডিয়ান রিদম: সূর্যের আলো আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লক নিয়ন্ত্রণ করে। শীতে এর ছন্দপতন ঘটে।

উইন্টার ব্লুজ থেকে মুক্তির প্রাকৃতিক উপায়

১. সূর্যের আলোয় থাকুন (Light Therapy): এটিই সবচেয়ে কার্যকরী ওষুধ। প্রতিদিন সকালে বা দুপুরে অন্তত ২০-৩০ মিনিট গায়ে রোদ লাগান। জানালার পর্দা সরিয়ে দিন যাতে ঘরে আলো ঢোকে। কর্মক্ষেত্রে জানালার পাশে বসার চেষ্টা করুন।

২. ভিটামিন ডি ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার: ভিটামিন ডি এর ঘাটতি বিষণ্ণতার বড় কারণ।

  • খাবার: ডিমের কুসুম, সামুদ্রিক মাছ, মাশরুম এবং ফোর্টিফাইড দুধ।
  • ওমেগা-৩: আখরোট, তিসির বীজ এবং তৈলাক্ত মাছ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং মুড বুস্ট করে।

৩. শরীরচর্চা বা ব্যায়াম: ব্যায়াম করলে শরীর থেকে ‘এন্ডোরফিন’ (Endorphins) নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে ব্যথা কমায় এবং মন ভালো করে দেয়। শীতে জিমে যেতে ইচ্ছে না করলে ঘরেই নাচ, যোগব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করুন।

৪. সামাজিক মেলামেশা: শীতে আমরা গুটিয়ে থাকি, যা একাকীত্ব বাড়ায়। বন্ধুদের সাথে দেখা করা, পরিবারের সাথে গল্প করা বা ফোনে কথা বলা মনকে চাঙ্গা রাখে।

৫. কার্বোহাইড্রেটের লোভ সামলান: শীতে মিষ্টি বা কার্বোহাইড্রেট খেতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি সাময়িক আনন্দ দিলেও পরে ক্লান্তি ও অবসাদ বাড়িয়ে দেয়। এর বদলে ফল, সবজি ও প্রোটিন যুক্ত খাবার খান।

যদি এই মন খারাপের ভাব আপনার দৈনন্দিন কাজ, ঘুম বা খাওয়ার রুচিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলে এবং এটি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শীতের বিষণ্ণতা সাময়িক। একটু সচেতনতা, রোদ পোহানো এবং সক্রিয় জীবনযাপনের মাধ্যমে আপনি এই মেঘাচ্ছন্ন ভাব কাটিয়ে শীতকেও উপভোগ করতে পারেন।

Scroll to Top