মাসিক চক্রের আগে প্রায় ৮০% নারী শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তিতে ভোগেন, যা ‘প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম’ বা পিএমএস (PMS) নামে পরিচিত। মেজাজের ওঠানামা, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, পেটে ও স্তনে ব্যথা, মাথাব্যথা এবং ক্লান্তি, এই লক্ষণগুলো জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে তোলে। পিএমএস শুরু হয় সাধারণত পিরিয়ড শুরু হওয়ার এক বা দুই সপ্তাহ আগে এবং পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর তা ধীরে ধীরে কমে যায়। যদিও পিএমএস-এর নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ নেই, তবে হরমোনের পরিবর্তন এবং পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও কিছু জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে পিএমএস-এর তীব্রতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
পিএমএস কেন হয়?
মাসিক চক্রের দ্বিতীয়ার্ধে (ডিম্বস্ফোটনের পর) ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ করে ওঠানামা করে। এই ওঠানামা সরাসরি মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার, বিশেষ করে ‘সেরোটোনিন’ এর মাত্রাকে প্রভাবিত করে। সেরোটোনিন হলো সেই রাসায়নিক যা আমাদের মেজাজ, ঘুম ও ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
যখন সেরোটোনিনের মাত্রা কমে যায়, তখনই বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, এবং খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ (বিশেষ করে মিষ্টির প্রতি) দেখা দেয়। আর তলপেটে ব্যথা বা ক্র্যাম্প হওয়ার কারণ হলো প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন হরমোনের উচ্চ মাত্রা।
পিএমএস উপশমের ডায়েট
পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা PMS এর সময় রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে পারে এমন খাবারের ওপর জোর দেন।
যা খাবেন:
১. ম্যাগনেসিয়াম (Magnesium): এটি একটি প্রাকৃতিক পেশি শিথিলকারী। এটি তলপেটের ক্র্যাম্প এবং মাসিকের মাথাব্যথা কমাতে কার্যকর।
- উৎস: ডার্ক চকোলেট, কুমড়োর বীজ, পালং শাক, বাদাম (কাঠবাদাম, কাজু)।
২. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি: গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি গ্রহণ করলে PMS এর ঝুঁকি এবং তীব্রতা প্রায় ৪০% পর্যন্ত কমে যায়।
- উৎস: দুধ, দই (টক দই), পনির, তৈলাক্ত মাছ।
৩. ভিটামিন বি৬ (Pyridoxine): এটি সেরোটোনিন উৎপাদনে সহায়তা করে এবং মেজাজের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
- উৎস: ডিম, মুরগির মাংস, কলা, আলু, ওটস।
৪. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: এর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণাগুণ প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন হরমোনের প্রভাব কমায়, ফলে পেটে ব্যথার তীব্রতা কমে।
- উৎস: সামুদ্রিক মাছ, আখরোট, তিসির বীজ।
৫. জটিল শর্করা (Complex Carbs): লাল আটা, ওটস, ব্রাউন রাইস রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ায়, যা মেজাজকে স্থিতিশীল রাখে।
যা খাবেন না:
১. লবণ ও সোডিয়াম: লবণ শরীরের ফ্লুইড রিটেনশন বাড়ায়, যার ফলে পেট ফুলে যাওয়া (Bloating) এবং স্তনে ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা বাড়ে।
২. ক্যাফেইন: কফি, চা বা এনার্জি ড্রিংকসে থাকা ক্যাফেইন উদ্বেগ, দ্রুত হৃৎস্পন্দন এবং স্তনের সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে।
৩. সরল শর্করা ও চিনি: ক্যান্ডি, চিপস বা প্যাকেটজাত মিষ্টি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা পরে হঠাৎ কমে গিয়ে মেজাজ খারাপ ও ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়।
৪. অ্যালকোহল: অ্যালকোহল বিষণ্ণতা ও ঘুমের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
লাইফস্টাইল টিপস:
- ব্যায়াম: নিয়মিত হালকা কার্ডিও বা হাঁটাচলা পিএমএস এর লক্ষণ কমাতে সাহায্য করে।
- ঘুম: পিরিয়ডের আগের দিনগুলোতে ৭-৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট: যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
পিএমএস এর কষ্ট কমাতে ডায়েট ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন একযোগে কাজ করে। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করে আপনি আপনার মাসিক চক্রকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারেন।
রেফারেন্স লিঙ্ক:





