প্রস্রাবের সংক্রমণ বা ইউটিআই (Urinary Tract Infection) হলো নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অন্তত ৬০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় ইউটিআই-এর অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং অনেকের ক্ষেত্রেই এটি বারবার দেখা দেয়।
ইউটিআই অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে, প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, এবং পেটে অস্বস্তি এর প্রধান লক্ষণ।
ইউটিআই কেন বারবার হয়, এর পেছনের বিজ্ঞান কী এবং কীভাবে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এর পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায় এই কনটেন্টে তা আলোচনা করা হলো।
নারীদের কেন বেশি ইউটিআই হয়?
ইউটিআই সাধারণত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি ই. কলি (E. coli) নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে ঘটে, যা সাধারণত কোলন বা বৃহদন্ত্রে থাকে।
- শারীরিক গঠন: নারীদের মূত্রনালী বা ইউরেথ্রা (Urethra) পুরুষের তুলনায় অনেক ছোট (প্রায় ১.৫ ইঞ্চি)। এই ছোট দূরত্বই মলদ্বার থেকে ব্যাকটেরিয়াকে মূত্রাশয়ে পৌঁছানো সহজ করে তোলে।
- বারবার সংক্রমণ: কিছু ব্যাকটেরিয়ার মূত্রাশয়ের ভেতরের স্তরে আটকে থাকার বিশেষ ক্ষমতা থাকে। অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শেষ হলেও কিছু ব্যাকটেরিয়া ভেতরে লুকিয়ে থাকে এবং অনুকূল পরিবেশ পেলে আবার সংক্রমণ সৃষ্টি করে।
ইউটিআই-এর প্রধান লক্ষণসমূহ:
- প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথা অনুভব করা।
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া, কিন্তু অল্প পরিমাণে প্রস্রাব হওয়া।
- পেটে (তলপেট) ব্যথা বা অস্বস্তি।
- প্রস্রাবে তীব্র দুর্গন্ধ বা ঘোলাটে ভাব।
- জ্বর বা পিঠের নিচের দিকে ব্যথা (যদি সংক্রমণ কিডনিতে পৌঁছায়)।
ইউটিআই প্রতিরোধে করণীয়
ইউটিআই এর চিকিৎসায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। তবে প্রতিরোধই হলো সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা।
যা খাবেন:
১. প্রচুর পানি: ইউটিআই প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হলো হাইড্রেটেড থাকা। প্রচুর পানি পান করলে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়, যা মূত্রনালী থেকে ব্যাকটেরিয়াকে পরিষ্কার করে দেয়। দিনে কমপক্ষে ২.৫ থেকে ৩ লিটার পানি পান করুন।
২. ক্র্যানবেরি জুস (Cranberry Juice): ক্র্যানবেরিতে রয়েছে ‘প্রোঅ্যান্থোসায়ানিডিনস’ (Proanthocyanidins – PACs) নামক যৌগ।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই যৌগগুলো ই. কলি ব্যাকটেরিয়াকে মূত্রাশয়ের প্রাচীরে লেগে থাকতে বাধা দেয়। তবে চিনিমুক্ত ক্র্যানবেরি জুস পান করুন।
৩. প্রোবায়োটিক: টক দই বা প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট মূত্রনালীর স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখে, যা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে।
৪. ভিটামিন সি: ভিটামিন সি মূত্রের অম্লতা (Acidity) বাড়ায়। অ্যাসিডিক পরিবেশে বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করতে পারে না।
- উৎস: লেবু, আমলকী, পেয়ারা, কমলা।
যা খাবেন না:
১. অতিরিক্ত ক্যাফেইন: চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় মূত্রাশয়কে উত্তেজিত করে এবং প্রস্রাবের বেগ বাড়িয়ে তোলে, যা ইউটিআই এর লক্ষণগুলো বাড়িয়ে দিতে পারে।
২. অ্যালকোহল: অ্যালকোহল মূত্রাশয়ের আস্তরণকে জ্বালাতন করে এবং শরীরকে ডিহাইড্রেটেড করে।
৩. অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার: চিনি ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাবার হিসেবে কাজ করে এবং তাদের বংশবৃদ্ধি উৎসাহিত করে।
কার্যকরী ঘরোয়া টিপস ও ব্যক্তিগত সতর্কতা:
- সঠিক পরিচ্ছন্নতা: টয়লেট ব্যবহারের পর সবসময় সামনে থেকে পেছনে (Front to Back) পরিষ্কার করুন। এটি মলদ্বার থেকে ব্যাকটেরিয়াকে মূত্রনালীর দিকে আসা রোধ করে।
- যৌনতার পরে প্রস্রাব: যৌন মিলনের পরপরই প্রস্রাব করা উচিত। এটি মিলনের সময় মূত্রনালীতে প্রবেশ করা ব্যাকটেরিয়াকে বের করে দেয়।
- অতিরিক্ত সাবান এড়িয়ে চলুন: যোনি অঞ্চলে সুগন্ধিযুক্ত সাবান, স্প্রে বা ডুশ ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এগুলো প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে।
ইউটিআই এর সংক্রমণ ঘটলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স শেষ করুন। কিন্তু প্রতিরোধের জন্য প্রচুর পানি পান, সঠিক ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং প্রোবায়োটিক ও ক্র্যানবেরি জুসের মতো খাবারকে আপনার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ করে নিন।
রেফারেন্স লিঙ্ক:





