শীতকাল আর পিঠা-পুলির উৎসব, এই দুটি যেন একে অপরের পরিপূরক। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, কিংবা তেলের পিঠা ছাড়া শীতের সকাল বা সন্ধ্যা অসম্পূর্ণ মনে হয়।
কিন্তু যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করছেন বা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই সুস্বাদু খাবারগুলো চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মন চায় খেতে, কিন্তু স্বাস্থ্য বাধা দেয়।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, আপনাকে পছন্দের খাবার পুরোপুরি বাদ দিতে হবে না; শুধু খাওয়ার ধরণ ও পরিমাণে একটু পরিবর্তন আনলেই স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে পিঠা উপভোগ করা সম্ভব।
কেন শীতে ভাজা-পোড়া বেশি খেতে ইচ্ছে করে?
শীতে আমাদের শরীর নিজেকে গরম রাখতে বেশি শক্তি খরচ করে, তাই মেটাবলিজম কিছুটা বাড়ে। এ কারণে আমাদের ক্ষুধা বাড়ে এবং শরীর কার্বোহাইড্রেট বা ফ্যাট জাতীয় খাবার (যা দ্রুত শক্তি দেয়) খাওয়ার জন্য সংকেত পাঠায়। এছাড়া শীতে ‘সেরোটোনিন’ হরমোন কমে যাওয়ায় মন ভালো করতে আমরা অজান্তেই মিষ্টি বা ভাজা খাবারের দিকে ঝুঁকি।
স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পিঠা খাওয়ার স্মার্ট টিপস:
১. ভাপা ও চিতই পিঠাকে প্রাধান্য দিন: তেলে ভাজা পিঠার (যেমন মালপোয়া বা পাকন পিঠা) চেয়ে ভাপে তৈরি পিঠা অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। ভাপা পিঠা বা চিতই পিঠায় তেল থাকে না, তাই ক্যালোরি কম থাকে। তবে চিতই পিঠার সাথে অতিরিক্ত ঝাল ভর্তা বা ভুনা মাংস খাওয়ার সময় তেলের পরিমাণ খেয়াল রাখুন।
২. চিনির বিকল্প গুড় (পরিমিত): সাদা চিনির বদলে খেজুরের গুড় ব্যবহার করা ভালো। গুড়ে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম থাকে, যা চিনিতে নেই। তবে মনে রাখবেন, গুড় ও চিনির ক্যালোরি প্রায় সমান। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে গুড়ও খুব সীমিত পরিমাণে খেতে হবে অথবা স্টিভিয়া (Stevia) ব্যবহার করে পিঠা তৈরি করতে পারেন।
৩. চালের গুঁড়োর সাথে ওটস বা লাল আটা: পিঠা মানেই চালের গুঁড়ো, যা সরল শর্করা। এটি দ্রুত সুগার বাড়ায়। স্বাস্থ্যকর করতে পিঠার মিশ্রণে কিছু পরিমাণ ওটস বা লাল আটা মিশিয়ে নিতে পারেন। এতে ফাইবার বাড়বে এবং সুগার স্পাইক কম হবে। পাটিসাপটা পিঠার ক্ষীর তৈরিতে স্কিমড মিল্ক বা লো-ফ্যাট দুধ ব্যবহার করুন।
৪. পোর্শন কন্ট্রোল (Portion Control): সবচেয়ে জরুরি হলো পরিমাণ। একবারে ৫-৬টি পিঠা না খেয়ে, ১টি বা ২টি খান। পিঠাকে মূল খাবার (Lunch/Dinner) হিসেবে না খেয়ে, সকালের নাস্তা বা বিকালের হালকা নাস্তা হিসেবে খান।
৫. তেল পুনর্ব্যবহার করবেন না: বাইরের ভাজা পিঠা এড়িয়ে চলুন। কারণ দোকানে একই তেল বারবার গরম করে ব্যবহার করা হয়, যা ট্রান্স ফ্যাট ও কার্সিনোজেনিক (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী) উপাদান তৈরি করে। ঘরে ভাজা পিঠা তৈরির সময় ফ্রেশ তেল ব্যবহার করুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ
যাদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে, তারা খালি পেটে ভাজা পিঠা খাবেন না। পিঠা খাওয়ার আগে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিন, এতে বেশি খাওয়ার প্রবণতা কমবে। আর পিঠা খাওয়ার পর অবশ্যই একটু হাঁটাহাঁটি করবেন যাতে অতিরিক্ত ক্যালোরি বার্ন হয়।
ঐতিহ্য ও স্বাস্থ্য, দুটিই বজায় রাখা সম্ভব। সচেতনভাবে এবং পরিমিত পরিমাণে খেয়ে এই শীতে পিঠা-পুলির আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।





