শীতের আগমনের সাথে সাথে বয়স্কদের এবং আর্থ্রাইটিস বা বাতের রোগীদের কষ্টের সীমা থাকে না। তাপমাত্রা কমার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে জয়েন্টের ব্যথা, আড়ষ্টতা এবং ফোলা ভাব। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হাত-পা নাড়াতে কষ্ট হয়।
কিন্তু কেন এমন হয়? এটি কি শুধুই মনের ভুল, নাকি এর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ আছে? আজকের কনটেন্টে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব এবং জানব কীভাবে সঠিক খাবার ও জীবনযাত্রার মাধ্যমে এই ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
শীতে ব্যথা কেন বাড়ে?
বিজ্ঞানীরা এর পেছনে প্রধানত ‘ব্যারোমেট্রিক প্রেসার’ (Barometric Pressure) বা বায়ুমণ্ডলের চাপ কমে যাওয়াকে দায়ী করেন।
১. টিস্যু প্রসারণ: শীতকালে বায়ুমণ্ডলের চাপ কমে যায়। এর ফলে আমাদের শরীরের টিস্যুগুলো সামান্য প্রসারিত হয়। এই প্রসারিত টিস্যুগুলো জয়েন্টের ভেতরে থাকা স্নায়ুর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে ব্যথা অনুভূত হয়।
২. সাইনোভিয়াল ফ্লুইড: আমাদের জয়েন্টের হাড়গুলোর মাঝখানে ‘সাইনোভিয়াল ফ্লুইড’ নামে এক ধরণের তরল থাকে, যা লুব্রিকেন্ট বা গ্রিজের মতো কাজ করে। তাপমাত্রা কমলে এই তরলটি ঘন বা আঠালো হয়ে যায়। ফলে জয়েন্ট নাড়াচাড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ‘স্টিফনেস’ বা আড়ষ্টতা দেখা দেয়।
৩. রক্ত সঞ্চালন: শীতে শরীর তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো (হার্ট, লাংস) গরম রাখতে হাত-পায়ের দিকে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়। এতে জয়েন্টগুলো ঠান্ডা ও ব্যথাতুর হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকের পরামর্শ: বাতের ব্যথা কমাতে ডায়েট
খাদ্যাভ্যাস বাতের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে জাদুর মতো কাজ করতে পারে। একে ‘অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট’ বলা হয়।
যা খাবেন:
১. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: এটি প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন কমানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকরী। সামুদ্রিক মাছ (স্যামন, টুনা), ইলিশ মাছ, আখরোট এবং তিসির বীজ ওমেগা-৩ এর সেরা উৎস।
২. হলুদ ও আদা: হলুদে থাকা ‘কারকিউমিন’ এবং আদার ‘জিঞ্জেরল’ প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। ব্যথানাশক ওষুধের বদলে রান্নায় এদের ব্যবহার বা আদা-হলুদ চা পান করা উপকারী।
৩. ভিটামিন ডি: শীতে রোদ কম থাকায় ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হয়, যা হাড়ের ব্যথা বাড়ায়। মাশরুম, ডিমের কুসুম এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন।
৪. ভিটামিন সি: লেবু, কমলা, পেয়ারাতে থাকা ভিটামিন সি কার্টিলেজ বা হাড়ের সংযোগস্থলের টিস্যু ভালো রাখতে সাহায্য করে।
যা খাবেন না:
১. রেড মিট: গরু বা খাসির মাংসে থাকা ফ্যাট প্রদাহ বাড়ায়।
২. চিনি ও প্রসেসড ফুড: বিস্কুট, চিপস বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার জয়েন্টের ফোলা ভাব বাড়িয়ে দেয়।
৩. নাইটশেড সবজি (কারো কারো ক্ষেত্রে): কিছু বাতের রোগীর ক্ষেত্রে বেগুন, টমেটো বা আলু ব্যথা বাড়াতে পারে। এটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তাই নিজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বাদ দিন।
ব্যথা কমাতে কার্যকরী টিপস
- ব্যায়াম: শীতে নড়াচড়া কম করলে ব্যথা বাড়বে। ঘরের ভেতরেই হালকা স্ট্রেচিং বা হাঁটাচলা করুন।
- গরম সেঁক: জয়েন্টে হট ওয়াটার ব্যাগ বা গরম কাপড়ের সেঁক দিলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং সাইনোভিয়াল ফ্লুইড পাতলা হয়, ফলে ব্যথা কমে।
- লেয়ারিং: জয়েন্টগুলো (হাঁটু, কনুই) গরম কাপড়ে ঢেকে রাখুন।





