বাংলাদেশে শীতকাল এলে শিশুদের মধ্যে সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং ত্বক শুষ্কতার মতো সমস্যা দ্রুত বেড়ে যায়। শীতের সকালে বাতাস ঠান্ডা ও শুষ্ক থাকায় শিশুর শ্বাসনালী সহজে উত্তেজিত হয় এবং বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় তারা সর্দি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, আরএসভি এবং অন্যান্য শ্বাসজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।
স্কুল, প্লে গ্রুপ এবং ডে কেয়ারের মতো বদ্ধ পরিবেশে শিশুরা একসঙ্গে থাকায় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার গতি আরও বেড়ে যায়। শীতে নাকের ভেতরের আর্দ্র ঝিল্লি শুকিয়ে যায়, ফলে ভাইরাস শরীরে ঢোকার সুযোগ আরও বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শীতকালের বায়ুদূষণ, যা শিশুদের শ্বাসতন্ত্রকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
শীতে শিশুদের প্রতিদিনের যত্ন
১. সঠিকভাবে গরম কাপড় পরানো
শিশুকে গরম কাপড় পরাতে হবে, তবে অতিরিক্ত ভারী পোশাক দিয়ে ঘেমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না। ঘাম শরীরে ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি বাড়ায়।
২. বাইরে বের হলে মাথা, কান ও পা ঢেকে রাখা
মাথা, কান এবং পায়ে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যায়। তাই বাইরে গেলে টুপি, কানঢাকা কাপড় ও মোজা ব্যবহার করুন।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান করানো
শীতে শিশুরা পানি কম পান করে, ফলে শরীর শুষ্ক হয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি প্রতিদিন নিশ্চিত করুন।
৪. ঘর ধুলামুক্ত রাখা
ধুলাবালি শ্বাসতন্ত্রের অ্যালার্জি ও কাশি বাড়ায়। তাই ঘর পরিষ্কার রাখা জরুরি।
৫. সর্দি কাশিতে গরম পানীয়
সর্দি কাশি শুরু হলে গরম পানি ও হালকা বাষ্প শিশুকে আরাম দিতে পারে। তবে খুব ছোট শিশুকে বাষ্প দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা প্রয়োজন।
৬. ভোরের শীত এড়িয়ে চলা
অতিরিক্ত ঠান্ডা ভোরের সময়ে বাইরে যাওয়া কমালে শ্বাসনালী উত্তেজনা কমে।
৭. নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস
ভাইরাস সাধারণত হাত, মুখ, নাকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। তাই হাত ধোয়ার অভ্যাস অপরিহার্য।
শীতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধে সহায়ক খাবার
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উল্লেখিত উপকারিতাসহ
এগুলি রোগ নিরাময় করে এমন প্রমাণ নেই, তবে পুষ্টিগুণের কারণে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শ্বাসতন্ত্রের সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
১. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলঃ যেমন মাল্টা, কমলা, লেবু, পেয়ারা
কীভাবে সাহায্য করে
ভিটামিন সি ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে এবং সর্দি-কাশির সময়কাল কমাতে সহায়ক হতে পারে (Mayo Clinic উল্লেখ)।
পরামর্শ
সকালের নাশতায় বা দুপুরের খাবারের পর ফল দেওয়া যেতে পারে।
২. মৌসুমি ফল (কলা, আপেল)
কীভাবে সাহায্য করে
আপেলে রয়েছে কুয়েরসেটিন, যা একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত আপেল খেলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কিছুটা ভালো থাকে (European Respiratory Journal)।
কলা শক্তি দেয় এবং পটাশিয়াম শ্বাসনালির কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
৩. ডিম
কীভাবে সাহায্য করে
ডিমে রয়েছে প্রোটিন, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য পুষ্টি যা শিশুর ইমিউন সিস্টেমকে সমর্থন দেয়।
ভিটামিন ডি ঘাটতি শ্বাসজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বেশ কিছু গবেষণায় উল্লেখ আছে।
৪. মাছঃ যেমন রুই, কাতলা, টুনা
কীভাবে সাহায্য করে
মাছের ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড প্রদাহ কমাতে সহায়ক বলে কিছু গবেষণায় উল্লেখ আছে (NIH)।
যদিও সরাসরি সর্দি-কাশি প্রতিরোধে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
৫. গরম স্যুপ বা ঝোলঃ যেমন সবজির স্যুপ, মুরগির স্যুপ
কীভাবে সাহায্য করে
স্যুপ শরীর গরম রাখে এবং নাকের বন্ধভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
Chicken soup এর mild anti-inflammatory effect আছে বলে কিছু প্রাথমিক তথ্য রয়েছে, তবে নিশ্চিত নয়।
৬. দই
কীভাবে সাহায্য করে
দইয়ের প্রোবায়োটিক উপাদান gut health উন্নত করে, যা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে (WHO ও NIH উল্লেখ)।
শিশুর পেটে সমস্যা না থাকলে পরিমাণমতো দই খাওয়ানো যেতে পারে।
৭. আদা ও মধুর গরম পানি (এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য)
কীভাবে সাহায্য করে
আদায় anti-inflammatory উপাদান আছে এবং গরম পানি গলা আরাম দেয়।
মধু এক বছরের কম বয়সী শিশুকে দেওয়া যাবে না (WHO নির্দেশিকা)।
কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে
- শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত শ্বাস নিলে ।
- বুকে শব্দ বা শ্বাস নিতে কষ্ট হলে ।
- তিন দিনের বেশি জ্বর থাকলে ।
- বারবার বমি হলে বা খাবার কম খেলে ।
- শিশু অস্বাভাবিকভাবে দুর্বল বা নিস্তেজ হয়ে পড়লে ।
এসব উপসর্গ দেখা গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঠান্ডা মৌসুমে শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সক্রিয়তা বাড়ে, তাই ছোট শিশুদের নিউমোনিয়ার ঝুঁকি এই সময়ে তুলনামূলক বেশি। শীতের সময় পানি কম পান করার প্রবণতা থেকেও ডিহাইড্রেশন বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।





