প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে কিছু চুল পড়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যখনই চিরুনি বা বালিশে চুলের গোছা দেখতে পাই, তখনই দুশ্চিন্তা শুরু হয়। চুল পড়া কমাতে আমরা প্রায়শই দামি শ্যাম্পু, তেল বা হেয়ার মাস্কের পেছনে ছুটি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, চুলের স্বাস্থ্যও আমাদের শরীরের ভেতরের পুষ্টির ওপর নির্ভরশীল। একটি স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল ভেতর থেকেই পুষ্টি পায়। আমাদের চুল মূলত ‘কেরাটিন’ নামক এক ধরনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। তাই শরীরে যদি প্রোটিন, ভিটামিন বা মিনারেলসের ঘাটতি থাকে, তবে তার প্রথম প্রভাব পড়ে চুলের ওপর। চুল হয়ে ওঠে নিষ্প্রাণ, ভঙ্গুর এবং ঝরে পড়তে শুরু করে।
চুলের স্বাস্থ্যে কোন পুষ্টির কী ভূমিকা?
১. প্রোটিন (চুলের প্রধান গাঠনিক উপাদান): যেহেতু চুল নিজেই প্রোটিন দিয়ে তৈরি, তাই খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের ঘাটতি হলে চুল দুর্বল হয়ে যায় এবং চুলের বৃদ্ধি কমে যায়।
- কী খাবেন: মাছ, মুরগির মাংস, ডিম, ডাল, টক দই, ছানা বা পনির। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এই প্রোটিন জাতীয় খাবারগুলো অবশ্যই রাখুন।
২. বায়োটিন (ভিটামিন বি৭): বায়োটিনকে ‘চুলের ভিটামিন’ বলা হয়। এটি কেরাটিনের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে, যা চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং চুলকে ঘন করে।
- কী খাবেন: ডিমের কুসুম (সেদ্ধ), কাঠবাদাম, আখরোট, মিষ্টি আলু, মাশরুম এবং ডাল বায়োটিনের ভালো উৎস।
৩. আয়রন (চুলের গোড়ায় অক্সিজেন): চুলের গোড়া বা ফলিকলে রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানো খুব জরুরি। আয়রন বা লৌহ এই অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে। শরীরে আয়রনের ঘাটতি (অ্যানিমিয়া) চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে।
- কী খাবেন: কলিজা, রেড মিট, মুরগির মাংস, মাছ, ডাল, পালং শাক, বিট এবং খেজুর।
৪. ভিটামিন সি (আয়রন শোষক ও কোলাজেন): ভিটামিন সি দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। এক, এটি শরীরকে আয়রন শোষণে সাহায্য করে। দুই, এটি ‘কোলাজেন’ নামক প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা চুলকে শক্তিশালী করে।
- কী খাবেন: আমলকী, পেয়ারা, লেবু, কমলা, ক্যাপসিকাম এবং টমেটো। (টিপস: পালং শাক বা ডালের সাথে লেবু চিপে খেলে আয়রন ভালো শোষিত হয়)।
৫. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (মাথার ত্বক বা স্ক্যাল্পের স্বাস্থ্য): চুলের গোড়া বা স্ক্যাল্প যদি শুষ্ক ও রুক্ষ হয়, তবে চুল পড়া বাড়বে। ওমেগা-৩ স্ক্যাল্পকে আর্দ্র রাখে, প্রদাহ কমায় এবং চুলের গোড়ায় পুষ্টি জোগায়।
- কী খাবেন: তৈলাক্ত মাছ (ইলিশ, স্যামন), আখরোট, তিসির বীজ (Flaxseeds) এবং চিয়া সিড।
৬. জিঙ্ক এবং ভিটামিন ই:
- জিঙ্ক: এটি চুলের টিস্যু মেরামত এবং বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। স্ক্যাল্পের তৈল গ্রন্থিগুলোকে ঠিকমতো কাজ করতে সাহায্য করে। (উৎস: ডাল, কুমড়োর বীজ, মাংস)।
- ভিটামিন ই: এটি একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা স্ক্যাল্পকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে। (উৎস: কাঠবাদাম, সূর্যমুখীর বীজ)।
যে অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলবেন:
- ক্র্যাশ ডায়েট: হঠাৎ করে খুব কম খাওয়া বা ওজন কমানোর জন্য কঠোর ডায়েট করলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি হয় এবং চুল পড়া বেড়ে যায়।
- অতিরিক্ত চিনি: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার শরীরে প্রদাহ বাড়ায় যা চুলের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
স্বাস্থ্যকর, ঘন ও লম্বা চুলের চাবিকাঠি আপনার রান্নাঘরেই রয়েছে। শুধু বাহ্যিক যত্ন নয়, প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, বায়োটিন এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। একটি সুষম ডায়েটই ভেতর থেকে আপনার চুলকে শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করে তুলবে।





