কোমর ব্যথা আজ বাংলাদেশের অন্যতম সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। মাঠের শ্রমিক থেকে শুরু করে অফিসে বসে কাজ করা কর্মজীবী প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় এই সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে কাজ করেন বা ভারী ওজন বহন করেন, তাদের মধ্যে ব্যাকপেইনের হার বেশি।
কীভাবে হয় কোমর ব্যথা
কোমর ব্যথা আসলে কোনো রোগ নয়, বরং এটি বিভিন্ন কারণে সৃষ্ট একটি উপসর্গ। সাধারণত এটি ঘটে পেশী, লিগামেন্ট, ডিস্ক বা স্নায়ুর সমস্যার কারণে। কখনো কখনো কিডনি ইনফেকশন বা পাথর থেকেও কোমর ব্যথা হতে পারে। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, ভারী জিনিস ওঠানো, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব বা ভুল ভঙ্গিতে বসা ব্যথার প্রধান কারণ।
কারা বেশি আক্রান্ত হন
বাংলাদেশের চিকিৎসক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবয়সী ও বয়স্কদের মধ্যে কোমর ব্যথা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মাঠে কাজ করা কৃষক, রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী এবং অফিসে বসে থাকা চাকরিজীবীরা এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত।
কোমর ব্যথার লক্ষণ
- নিচের পিঠে ব্যথা বা টান অনুভব
- ব্যথা পায়ের দিকে ছড়িয়ে যাওয়া (সায়াটিকা)
- পিঠ সোজা করতে কষ্ট হওয়া
- দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে না পারা
- নড়াচড়া বা হালকা চাপেই ব্যথা বেড়ে যাওয়া
যদি ব্যথা তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয়, একে ক্রনিক ব্যাকপেইন বলা হয় এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
কোমর ব্যথার চিকিৎসা
বাংলাদেশে বেশিরভাগ কোমর ব্যথা চিকিৎসা ছাড়াই ধীরে ধীরে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ বা ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে।
- ওষুধ: সাধারণত আইবুপ্রোফেন (Motrin, Advil), ন্যাপ্রোক্সেন (Aleve) বা প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। তবে কিডনির সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
- ফিজিওথেরাপি: ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে ব্যায়াম করলে পেশী শক্তিশালী হয় এবং ব্যথা কমে।
- ম্যাসাজ বা গরম সেঁক: বাংলাদেশে ঘরোয়া চিকিৎসা হিসেবে গরম পানির ব্যাগ বা তেল মালিশ খুব জনপ্রিয়। এটি পেশীর টান কমাতে সাহায্য করে।
- ইনজেকশন বা ওষুধ প্রয়োগ: যেসব রোগীর স্নায়ু চাপে ব্যথা হয়, তাদের জন্য স্টেরয়েড ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে।
- অস্ত্রোপচার: খুব গুরুতর ক্ষেত্রে, যেমন ডিস্ক ছিঁড়ে গেলে বা স্পাইনাল নার্ভ চেপে গেলে, অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।
বিকল্প চিকিৎসা ও ঘরোয়া প্রতিকার
বাংলাদেশে অনেকে আকুপাংচার, কাপ থেরাপি বা হিজামা এবং যোগব্যায়ামকেও কার্যকর মনে করেন। এসব পদ্ধতি ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে করা উচিত।
ঘরে বসে কয়েকটি উপায়েও ব্যথা উপশম করা যায়
- বরফ সেঁক ব্যথার প্রথম দিকে প্রদাহ কমায়।
- গরম সেঁক ব্যথা হ্রাস করে এবং রক্ত চলাচল বাড়ায়।
- নিয়মিত কোমর ও পেটের পেশী শক্ত করার ব্যায়াম করুন।
- সঠিক ভঙ্গিতে বসুন ও হাঁটুন।
বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্র ও জীবনযাপনের প্রভাব
ঢাকার মতো শহরে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বসে অফিস করা, যানজটের কারণে নড়াচড়া কম হওয়া এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ ব্যাকপেইনের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে গ্রামীণ শ্রমজীবীরা ভারী কাজ ও ভুল ভঙ্গিতে ওজন তোলার কারণে ব্যথায় ভোগেন।
গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা
বাংলাদেশে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে কোমর ব্যথা খুব সাধারণ। শরীরের ভারসাম্য বদলে যাওয়া, ওজন বৃদ্ধি এবং হরমোনের প্রভাবে পেশী শিথিল হওয়ায় ব্যথা হয়। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, বিশ্রাম এবং সঠিক ভঙ্গিতে বসা বা শোয়া এ সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।
প্রতিরোধের উপায়
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন বা হালকা ব্যায়াম করুন।
- দীর্ঘ সময় এক ভঙ্গিতে বসে থাকবেন না।
- মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করার সময় সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখুন।
- ভারী জিনিস তোলার সময় হাঁটু ভেঙে তুলুন, পিঠ দিয়ে নয়।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
কোমর ব্যথা বাংলাদেশের শহর ও গ্রামে সমানভাবে দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি গুরুতর নয় এবং নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক ভঙ্গি ও সচেতন জীবনযাপনে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা পা অবশ হয়ে গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সময়মতো পদক্ষেপ নিলে ব্যথামুক্ত ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।





